ইউরেনিয়াম কী, কেন আলোচনায়
‘ইউরেনিয়াম’ নামটি আজকাল নানা কারণে আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে এই মৌলটির সঙ্গে মিশে গেছে রাজনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। আধুনিক সভ্যতার জন্যে ইউরেনিয়াম যেমন একদিকে সম্ভাবনার প্রতীক, অন্যদিকে ধ্বংসেরও হাতিয়ার। অনেক সংকটে এটির ব্যবহার করা যায়। তবে এর দায়িত্বহীন ব্যবহার মানবসভ্যতার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
ইউরেনিয়াম কী?
ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ভারী ধাতব মৌল। এটি পৃথিবীর ভূত্বকে স্বল্প পরিমাণে পাওয়া যায়।
ইউরেনিয়াম দেখতে রুপালি-ধূসর রঙের। এটি পানির তুলনায় প্রায় ১৮.৭ গুণ ঘন। প্রকৃতিতে পাওয়া যাওয়া সব ধাতুর মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি ভারী। রাসায়নিক সারণিতে এর প্রতীক U এবং পারমাণবিক সংখ্যা ৯২।
১৭৮৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ মার্টিন হাইনরিখ ক্ল্যাপরথ পিচব্লেন্ড ইউরেনিয়াম মৌল আবিষ্কার করেন। তিনি ইউরেনাস গ্রহের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এর নাম রাখেন।
প্রায় ১০৭ বছর পর, ১৮৯৬ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী হেনরি বেকরেল আবিষ্কার করেন যে ইউরেনিয়াম স্বতঃস্ফূর্তভাবে অদৃশ্য রশ্মি নির্গত করে। সেটাই ছিল প্রথম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার।
এই দুটি ঘটনা পারমাণবিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।
ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর কিছু আইসোটোপের (পরমাণুর ভিন্ন রূপ) সহজে ভাঙার প্রবণতা। একে নিউক্লিয়ার ফিশন বলা হয়। ফিশনের সময় একটি পরমাণু ভেঙে দুটি ছোট পরমাণুতে বিভক্ত হয় এবং এতে বিপুল পরিমাণ শক্তি (তাপ এবং বিকিরণ) উৎপন্ন হয়। নিয়ন্ত্রিত উপায়ে এই শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
তুলনা দিয়ে বলা যায়, এক কেজি ইউরেনিয়াম-২৩৫ ফিশন থেকে প্রায় ২০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-আওয়ার শক্তি পাওয়া সম্ভব, যা ৩৪ লাখ টন বেশি কয়লার সমান।
কয় ধরনের ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়?
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে মূলত তিন ধরনের আইসোটোপ থাকে। পারমাণবিক সংখ্যা (এক্ষেত্রে ৯২) অপরিবর্তিত থাকলেও নিউক্লিয়াসে নিউট্রনের সংখ্যায় ভিন্নতা থাকলে এদেরকে পরস্পরের আইসোটোপ বলে।
এর মধ্যে প্রকৃতিতে ইউরেনিয়াম-২৩৮ সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। তবে এটি শক্তি উৎপাদনে কম কার্যকর। এটি ধীরে ধীরে তেজস্ক্রিয় ক্ষয় হয়ে লেড-২০৬-এ পরিণত হয় এবং প্লুটোনিয়াম-২৩৯ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
ইউরেনিয়াম-২৩৫ তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও বিদ্যুৎ ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি দিয়ে সহজে ফিশন বিক্রিয়া ঘটানো যায়।
ইউরেনিয়াম-২৩৪ খুবই অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। এটি ফিশনের জন্যও কম উপযোগী। ইউরেনিয়াম-২৩৮ ক্ষয় হয়ে এটি উৎপন্ন হয়।
ইউরেনিয়াম কী কাজে লাগে?
বিশ্বের অনেক দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউরেনিয়াম ব্যবহার হয়। বাংলাদেশের রূপপুরেও জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হবে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ন্ত্রিত ফিশনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়, যা পানিকে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি কার্বন-ডাইঅক্সাইড নির্গমন হয় না বলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ এখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। তবে এতে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার ব্যবস্থাপনা সহজ নয়।
পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের মাধ্যমে উৎপন্ন হয় তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ। এসব আইসোটোপ ক্যানসারের চিকিৎসা (রেডিওথেরাপি), কৃষি ক্ষেত্রে নতুন জাত উদ্ভাবন, মেডিক্যাল ইমেজিংয়ে (পিইটি সিটি স্ক্যান) এবং জীবাশ্বের মতো প্রাগৈতিহাসিক বস্তুর বয়স নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয়।
ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যবহার দেখা যায় সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে এই মৌল ব্যবহার করা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পর বর্জ্য হিসেবে অবশিষ্ট বা ডিপ্লিটেড ইউরেনিয়াম ট্যাঙ্কের বর্ম বা গোলাবারুদে ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি খুব শক্ত।
পারমাণবিক বোমা তৈরিতে ইউরেনিয়াম
পারমাণবিক ফিশন বোমার মূল উপাদান ইউরেনিয়াম। ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণু ভাঙলে প্রচণ্ড শক্তি ও অতিরিক্ত নিউট্রন বের হয়। এই নিউট্রন পাশের ইউরেনিয়াম পরমাণুকে ভাঙে। আর এভাবে মুহূর্তের মধ্যে চেইন রিঅ্যাকশন হয়ে বিপুল পরিমাণ শক্তি বেরিয়ে আসে।
এই অনিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন থেকেই জন্ম নেয় ভয়াবহ বিস্ফোরণ-পারমাণবিক বোমা।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা শহরে নিক্ষিপ্ত ‘লিটল বয়’ পারমাণবিক বোমাটিতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করা হয়েছিল। এক মুহূর্তেই শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিহত হয়। নাগাসাকিতে প্লুটোনিয়াম-ভিত্তিক বোমা ব্যবহৃত হয়, যার নাম ছিল 'ফ্যাট ম্যান'।
ইউরেনিয়াম ইস্যু কেন এত সংবেদনশীল?
ইউরেনিয়াম এমন একই উপাদান, যা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, আবার ভয়াবহ গণবিধ্বংসী অস্ত্রও তৈরি করা যায়।
দ্বিতীয় ব্যবহারটির জন্যই ইউরেনিয়ামের খনন, মজুত ও ব্যবহারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে কঠোর নজরদারি রাখা হয়। জাতিসংঘের অধীনস্ত আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) এই বিষয়টি তদারকি করে।
পরিবেশগত দিক থেকে ইউরেনিয়াম খনন তেজস্ক্রিয় দূষণ ঘটাতে পারে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা প্রাণ ও প্রকৃতির জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার সবচেয়ে বড় দুই উদাহরণ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল এবং জাপানের ফুকুশিমা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সৃষ্ট বিপর্যয়।





































