শুক্রবার , ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:২৪, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

আপডেট: ১৬:২৫, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ বন্ধুরাষ্ট্রগুলো, কূটনীতিতে চ্যালেঞ্জের বছর

আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ বন্ধুরাষ্ট্রগুলো, কূটনীতিতে চ্যালেঞ্জের বছর

অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনীতিতে গত এক বছর ছিল সবচেয়ে সংকটের সময়। এই সময়ে নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকার পক্ষ থেকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও বিশ্বের অন্য কোনো দেশের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া মেলেনি। ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে যাদের কাছে প্রত্যাশা ছিল সবেচেয়ে বেশি, তারাও গত এক বছরে আশ্বাস দেওয়া ছাড়া খুব বেশি কিছু করেনি। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলো থেকেও আশানুরূপ বড় কোনো সহযোগিতা আসেনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও নেই কোনো অগ্রগতি। 

বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটতম ও বৃহত্তম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। এই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। দিল্লির কাছে তাদের প্রত্যার্পণ চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ভারতবিরোধী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশ বিষয়ে অপপ্রচার নিয়ে সম্পর্কের তিক্ততা শুরু হয়। এরপর বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য প্রচার ও তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে হাইকমিশনারকে তলব ও পাল্টা তলবের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ও খুনিদের ভারতে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন অভিমুখে বিক্ষোভের কারণে ভিসা সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলবের ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যায়। এ নিয়ে হাইকমিশনের নিরাপত্তা ইস্যুতে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাকেও পাল্টা তলব করে ভারত।

এ ছাড়া ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশের মিশনগুলোর সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে হুমকির ঘটনায় ভারতের হাইকমিশনারকে আবার তলব করায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছায়। একই দিনে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকেও আবার তলব করে দেশটি। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে চলে যায়। দুই দেশের হাইকমিশনারকে পাল্টাপাল্টি তলব ও বিক্ষোভের মধ্যে উভয় দেশের ভিসা সেন্টারগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চরম অবনতির প্রমাণ। 

কূটনীতিকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অবনতি শুরু হলেও সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চলে দুপক্ষ থেকেই। এ লক্ষ্যে গত বছর ডিসেম্বরে দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকটি ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। ভারত চেয়েছিল শেখ হাসিনা ইস্যুটিকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে। আবার এটিও ইঙ্গিত দেয়, ঢাকার পরবর্তী যেকোনো নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রস্তুত আছে দিল্লি। পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মো. জসীম উদ্দিন নিজ নিজ দেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন। পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে জসীম উদ্দিন বলেন, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। বৈঠকের আগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি ছিল স্বীকার করে জসীম উদ্দিন বলেন, এই ঘাটতি পূরণে এ বৈঠকটি ছিল প্রাথমিক পদক্ষেপ। 

বাংলাদেশের নিকটতম ও আরেক বড় প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক আছে। তবে দেশটি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক সহযোগিতায় যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দিকে চীনের আগ্রহ বিবেচনায় নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন চীন সফর করেন। কিন্তু এসব সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে ছোটখাটো কিছু পদক্ষেপ ছাড়া বড় কোনো বিনিয়োগে যায়নি দেশটি। বরং চীন সরকারও অপেক্ষা করছে নির্বাচিত কোনো সরকারের অপেক্ষায়, যার সঙ্গে বড় কোনো সম্পর্কে এগোনো যায়। 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা ও সমর্থন ছাড়া বড় কোনো সহযোগিতা করেনি দেশটি। বরং সে দেশে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বড় আকারের শুল্ক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে ট্রাম্প সরকার। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং বিমান ও কৃষিপণ্য কেনার চুক্তি করা হয়। আরও কিছু শর্ত পূরণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির শুল্কহারে কিছুটা ছাড় দেয়। 

ইউরোপের দেশগুলো থেকেও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা ও সমর্থন ছাড়া বড় কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ইউরোপের বড় কোনো বিনিয়োগও আসেনি। বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি সুবিধাও বাড়েনি। বরং আগের সম্পর্কই স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে ইইউ দেশগুলো। 

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলো থেকেও আশানুরূপ বড় কোনো সহযোগিতা পায়নি অন্তর্বর্তী সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগও আসেনি, আবার জনশক্তি রপ্তানিও বাড়েনি। বরং সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমানসহ একাধিক শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে, যা এখনো খোলেনি। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটিও গত দেড় বছরে খোলা সম্ভব হয়নি।

তবে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। বেশ কিছু ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। কিন্তু বাণিজ্য কতটা বেড়েছে বা তাতে বাংলাদেশের কতটা লাভ হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এক কথায়, সব দেশই দেখতে চায় আগামী ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে কোন সরকার ক্ষমতায় আসছে। অর্থাৎ তারা অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নয়, বরং নির্বাচিত সরকারগুলোর সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়