শুক্রবার , ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

নাজমুস সাকিব, দিনাজপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮:০২, ৩ জানুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ১৮:০৪, ৩ জানুয়ারি ২০২৬

ঐতিহ্যের স্মারক দিনাজপুরের নয়াবাদ মসজিদ

ঐতিহ্যের স্মারক দিনাজপুরের নয়াবাদ মসজিদ

দিনাজপুরে অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রয়েছে। কোনোটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের কোনো অধ্যায়, কোনোটি দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো নয়াবাদ মসজিদ। প্রায় ৩০০ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদ দিনাজপুরের ঐতিহ্যের একটি অংশ বহন করে চলছে। আজ আমরা জানবো এই মসজিদের অবস্থান, ইতিহাস ও যাওয়া-আসার বৃত্তান্ত।

নয়াবাদ মসজিদের অবস্থান
জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং কান্তজিউ মন্দির থেকে মাত্র ১.৫ কিলোমিটার দূরত্বে কাহারোল উপজেলার নয়াবাদ গ্রামে অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদ।প্রায় ৩০০ বছর আগে  কান্তনগর মন্দিরের কারিগরদের দ্বারা নির্মিত এই মসজিদটি ইসলামিক ও স্থানীয় স্থাপত্যরীতির এক অনন্য সংমিশ্রণ। দিনাজপুরের এই নয়াবাদ মসজিদ ঘিরে রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। অবস্থানগত দিক থেকে  দূরত্ব  ​ঢাকা থেকে দিনাজপুরের নয়াবাদ মসজিদের দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ৩৩০ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে দিনাজপুর শহর পর্যন্ত সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ৩১০ কিমি, আর দিনাজপুর শহর থেকে এই মসজিদ আরও ২০ কিমি দূরে অবস্থিত।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য
​নয়াবাদ মসজিদের ইতিহাস পার্শ্ববর্তী কান্তজিউ মন্দিরের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, মসজিদটির ​নির্মাণকাল মসজিদটি ১৭৯৩ সালে নির্মিত হয় (তৎকালীন সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের রাজত্বকালে)। জানা যায়, কান্তজিউ মন্দির নির্মাণের জন্য পারস্য (বর্তমান ইরান) বা পশ্চিম ভারত থেকে যে মুসলিম স্থাপত্যশিল্পীরা এসেছিলেন, তারা তাদের নিজেদের নামাজের সুবিধার জন্য এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের প্রবেশপথের ওপর একটি শিলালিপি ছিল (যা বর্তমানে সংরক্ষিত), সেখানে এটি নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পাওয়া যায়।

টেরাকোটার নয়নাভিরাম স্থাপত্যশৈলী 
​নয়াবাদ মসজিদটি স্থাপত্যশৈলী ও গঠনের দিক থেকে বেশ আকর্ষণীয়। এটি মূলত এর অসাধারণ টেরাকোটা বা পোড়ামাটির নকশার জন্য বিখ্যাত। মসজিদের ছাদে তিনটি সমান আকারের গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতি মিনার বা টাওয়ার রয়েছে, যা মসজিদের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মসজিদটি আয়তাকার এবং এর আয়তন বাইরের দিক থেকে প্রায় ১২.৪৫ মিটার দীর্ঘ ও ৪.৪২ মিটার চওড়া। নয়াবাদ মসজিদের আরকেটি বিশেষ আকর্ষণ হলো ​পোড়ামাটির অলঙ্করণ। মসজিদের বাইরের দেয়ালে অসংখ্য আয়তাকার টেরাকোটা ফলক রয়েছে। এই ফলকগুলোতে ফুল, লতা-পাতা এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যদিও সময়ের বিবর্তনে অনেক নকশা এখন ক্ষয়ে গেছে। ​বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি।

পর্যটকদের জন্য আদর্শ ভ্রমণ স্থান
​মসজিদটি এখনো সচল এবং স্থানীয় মুসল্লিরা এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন। ​কান্তজিউ মন্দির দর্শনে আসা পর্যটকদের জন্য নয়াবাদ মসজিদ একটি বাড়তি আকর্ষণ। শান্ত গ্রাম্য পরিবেশে নদীর ধারে এর অবস্থান পর্যটকদের বিমোহিত করে। ​দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে অনেক টেরাকোটা ফলক নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বিভিন্ন সময়ে সংস্কার কাজ চালিয়ে মসজিদটির কাঠামো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পর্যটন সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো হলে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। 

যেভাবে যাবেন এবং খরচের বিস্তারিত
অবস্থানগত দিক থেকে  দূরত্ব  ​ঢাকা থেকে দিনাজপুরের নয়াবাদ মসজিদের দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ৩৩০ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে দিনাজপুর শহর পর্যন্ত সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ৩১০ কিমি, আর দিনাজপুর শহর থেকে এই মসজিদ আরও ২০ কিমি দূরে অবস্থিত। নয়াবাদ মসজিদে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন উপায় রয়েছে। আপনি সড়কপথ এবং রেলপথ—উভয় মাধ্যমেই যেতে পারেন। 

বাসে ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর বা আব্দুল্লাহপুর থেকে নাবিল পরিবহণ, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এসআর ট্রাভেলস বা শ্যামলী পরিবহণের বাসে দিনাজপুর যেতে হবে। দিনাজপুর শহরে নেমে অটোরিকশা বা সিএনজি নিয়ে কাহারোল উপজেলার নয়াবাদ গ্রামে যেতে পারেন।

​ট্রেনে ঢাকার কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে 'একতা এক্সপ্রেস', 'দ্রুতযান এক্সপ্রেস' বা 'পঞ্চগড় এক্সপ্রেস' ট্রেনে দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনে নামতে হবে। এরপর সেখান থেকে লোকাল বাস বা সিএনজিতে করে মসজিদটিতে যাওয়া যায়। আকাশপথে ঢাকা থেকে বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দর পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে বাসে বা প্রাইভেট কারে দিনাজপুর হয়ে নয়াবাদ মসজিদ যাওয়া সম্ভব।

বাস ভাড়া: নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৮০০ - ৯০০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ১২০০ - ১৮০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
ট্রেন ভাড়া: আসনের ধরনভেদে ভাড়া ভিন্ন হয়। সাধারণত শোভন চেয়ার ৫৫০ - ৬০০ টাকা, স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) ১০৫০ - ১২০০ টাকা এবং এসি বার্থ ১৮০০ টাকার আশেপাশে।
দিনাজপুর থেকে মসজিদ: দিনাজপুর শহর থেকে নয়াবাদ মসজিদ যেতে অটোরিকশা বা সিএনজিতে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে প্রায় ৫০ - ৮০ টাকা করে।

 

​নয়াবাদ মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত সুন্দর এবং এটি কান্তনগর মন্দিরের খুব কাছেই অবস্থিত। তাই আপনি একই দিনে কান্তজিউ মন্দির এবং নয়াবাদ মসজিদ—দুটি দর্শনীয় স্থানই ঘুরে দেখতে পারেন। নয়াবাদ মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মন্দিরের কারিগরদের হাত ধরে নির্মিত এই মসজিদটি আজও বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে তুলে ধরছে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়