অবশেষে ‘বোর্ড অব পিস’ ঘোষণা ট্রাম্পের, জাতিসংঘ নিয়ে শঙ্কা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে গাজার নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও টেকসই করার লক্ষ্য নিয়ে এই বোর্ড গঠিত হলেও ভবিষ্যতে এটি আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক ভূমিকায় কাজ করবে বলে বৃহস্পতিবার জানান তিনি।
সুইজারল্যান্ডে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (দাভোস) ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফাঁকে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, বোর্ডটি পুরোপুরি গঠিত হলে আমরা প্রায় যা খুশি তাই করতে পারব। আর তা হবে জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করে। তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের অপরিসীম সম্ভাবনা রয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
ট্রাম্প নিজেই এই বোর্ডের সভাপতিত্ব করবেন এবং এতে যোগ দিতে তিনি বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তবে গাজার যুদ্ধবিরতির বাইরেও বৈশ্বিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এই বোর্ড কাজ করবে— এমন ঘোষণায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বলা হচ্ছে এটি জাতিসংঘের ঐতিহ্যগত ভূমিকাকে দুর্বল করতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ— তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও কাতার এবং উদীয়মান শক্তি ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে বোর্ডে যোগ দিয়েছে। অন্যদিকে বড় বৈশ্বিক শক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত পশ্চিমা মিত্ররা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ট্রাম্প জানান, বোর্ডের স্থায়ী সদস্যদের প্রত্যেককে ১ বিলিয়ন ডলার করে অর্থায়ন করতে হবে। রয়টার্স জানিয়েছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো শীর্ষ বৈশ্বিক শক্তি, এমনকি ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিল না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এই বোর্ডের মূল লক্ষ্য হবে গাজার শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তবে এটি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কেউ এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা রুশ সম্পদ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ফিলিস্তিনি জনগণের সহায়তায় দিতে মস্কো প্রস্তুত।
ফ্রান্স এই উদ্যোগে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য বলেছে, আপাতত তারা এতে যোগ দিচ্ছে না। চীনও এখনো এ বিষয়ে কোনো অবস্থান স্পষ্ট করেনি।
উল্লেখ্য, ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রস্তাবে এই বোর্ড গঠনের বিষয়টি অনুমোদন পায়। তবে জাতিসংঘের মুখপাত্র রোলান্দো গোমেজ স্পষ্ট করে বলেন, বোর্ডের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা কেবল ওই নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরসহ ৭ দেশ ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যুক্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, এই বোর্ডের লক্ষ্য ছিল গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ করা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন তদারকি করা। কিন্তু প্রস্তাবিত সনদে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের নাম নেই, বরং এটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে জাতিসংঘের কিছু ভূমিকার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
‘বোর্ড অব পিস’ কী
ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট একটি নতুন আন্তর্জাতিক অন্তর্বর্তীকালীন সংস্থা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি ঘিরে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
এই সংস্থার নির্বাহী বোর্ডে রাখা হয়েছে বেশ কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তিকে। তাদের মধ্যে আছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, যিনি ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার অন্তর্ভুক্তি নিয়েই শুরু হয়েছে সমালোচনা। এ ছাড়া সংস্থাটির স্থায়ী সদস্য হতে এক বিলিয়ন ডলার ফি নির্ধারণ, এর ক্ষমতা ও ভূমিকা জাতিসংঘের কাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে কি না, এবং পুরো কাঠামোর স্বচ্ছতা—এসব বিষয় নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে।
সব মিলিয়ে, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এই নতুন সংস্থাটি শান্তির উদ্যোগ না হয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে— এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকেরা।
নথিতে বলা হয়েছে, ‘বোর্ড অব পিস একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। যা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, নির্ভরযোগ্যতা ও আইনের শাসন পুনপ্রতিষ্ঠা এবং সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিতে কাজ করবে।’
এতে আরো বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি তখনই কার্যকর হবে যখন কোনো কিছুর বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, সাধারণ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সমাধান করা হবে।’
বোর্ড অব পিসের চেয়ারম্যান হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিস্তৃত ক্ষমতার অধিকারী হবেন। তার হাতে কোনো দেশকে সদস্য করা কিংবা অপসারণের ক্ষমতা থাকবে। বোর্ডের কোনো সিদ্ধান্ত তখনই বাতিল হবে, যখন দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিরুদ্ধে ভোট দেবেন। প্রথম বছরে ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার মাধ্যমে কোনো দেশ ৩ বছরের জন্য বোর্ডের সদস্য হতে পারবে।





































