অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার খোঁজে বাংলাদেশ: সংকট থেকে পুনর্গঠন
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট- সব মিলিয়ে দেশ দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
তবে রেমিট্যান্স এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি, সরকারের কাঠামোগত সংস্কার, আইএমএফ-এর সহযোগিতা এবং বিনিময় হার ব্যবস্থার নমনীয়তা কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি সম্পূর্ণ ধ্বংস নয়, বরং একটি ‘কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন’ পর্যায়।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে আগের সরকারের পতন ঘটার পর অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে নির্বাচনের অনিশ্চয়তা, ব্যবসায়ীদের ওপর সরকারের সংযোগহীনতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছে।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার ছাড়া এই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না। ব্যাংকখাত, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা ঠিক না হলে বিনিয়োগ ফিরবে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে স্থিতিশীল সরকার না আসা পর্যন্ত ব্যবসার গতিশীলতা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রা
নভেম্বর ২০২৫ সালে দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ডিসেম্বর ২০২৫-এ তা বেড়ে ৮দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নভেম্বর মাসে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ, শহরে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং গ্রামে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
প্রায় তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ-সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরের পর প্রথমবার দুই অঙ্কে পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
রফতানি খাতের অবস্থা
বাংলাদেশের রফতানি টানা চার মাস ধরে পতনের মুখে রয়েছে। নভেম্বর ২০২৫-এ দেশের রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২৩ মিলিয়ন ডলার কম।
পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তৈরি পোশাক রফতানি ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৩১৪ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। কৃষিপণ্য রফতানি ২৫ শতাংশ কমে ৮৩ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। ওষুধ রফতানি ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২০ মিলিয়ন ডলারে সীমিত হয়েছে। হোম টেক্সটাইল পণ্যের রফতানি ৮ শতাংশ কমে ৬৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ২২ শতাংশ হ্রাস দেখা গেলেও, সমষ্টিগত হিসেবে এই খাতের রফতানি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রফতানি ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ বাজারে পাল্টা শুল্ক এবং চীনের শক্তিশালী প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন বাজার আবিষ্কার এবং পণ্যের মান উন্নয়নে জোর দেওয়া না হলে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন।
ব্যাংক খাত ও ঋণ চাপ
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে অস্থির। খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং ঋণের অতিরিক্ত চাপ দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং বড় কোম্পানি ঋণ নিয়ে সম্প্রসারণ করতে পারছে না।
বৈদেশিক ঋণও উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে ১০ হাজার ৪৪৮ কোটি ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালের ৭ হাজার ৩৫৫ কোটি ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ঋণ পরিশোধের বোঝা দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে, আর রফতানির তুলনায় বৈদেশিক ঋণ এখন ১৯২ শতাংশ।
বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাত
বাংলাদেশে বেসরকারি খাত দীর্ঘদিন স্থবির। উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা, লজিস্টিক সমস্যা এবং করের অতিরিক্ত চাপের কারণে নতুন বিনিয়োগ থেমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কর ব্যবস্থার অতিরিক্ত চাপ এবং নতুন নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জটিলতা তাদের জন্য ‘কর সন্ত্রাস’ এবং দুর্নীতি-হয়রানির ঝুঁকি তৈরি করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর আস্থা কমেছে, এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিল্প খাত (পিএমআই বিশ্লেষণ)
নভেম্বর ২০২৫-এ প্রাথমিক উৎপাদন সূচক (PMI) ৫৪ এ অবস্থান করছে। উৎপাদন খাতের সূচক ৫৮ দশমিক ৩, নির্মাণ ৫১ দশমিক ২, সেবা খাত ৫১ দশমিক ৬ এবং কৃষি খাত ৫৭ দশমিক ৪। যদিও সব সূচক ৫০-এর উপরে থাকায় সম্প্রসারণ দেখায়, আগের মাসের তুলনায় শিল্প খাতের বৃদ্ধি ধীর। নতুন ক্রয়াদেশে হ্রাস, জমে থাকা অর্ডারের পরিমাণ কমা এবং কর্মসংস্থানে সীমিত বৃদ্ধি উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সীমিত করছে।
সামাজিক প্রেক্ষাপট
বেকারত্ব বৃদ্ধি, আয়ের কমে যাওয়া এবং ক্রয়ক্ষমতার হ্রাস সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। গ্রামের মানুষের জীবনও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে। কর ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ছোট উদ্যোক্তারা দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা দেশের SME খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের পদক্ষেপ ও আইএফএফ সুপারিশ
সরকার দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, ধাপে ধাপে সরকারি ভর্তুকি কমানো হচ্ছে এবং কর রাজস্ব বৃদ্ধি করতে কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইএমএফ সুপারিশ দিয়েছে কঠোর আর্থিক নীতি বজায় রাখা, ননমনীয় বিনিময় হার বজায় রাখা এবং বাজেট ঘাটতি কমিয়ে কার্যকরভাবে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, টেকসই অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাজারে ভারসাম্য আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, নির্বাচিত সরকার হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরে আসবে এবং ব্যাংক ও জ্বালানি সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে। আইসিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু আহমেদ উল্লেখ করেন, উচ্চ সুদ, কর চাপ এবং জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, নতুন বাজার, নতুন পণ্য ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ছাড়া রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, ঋণের চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সমাপ্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকটে হলেও ধ্বংস হয়নি। ব্যবসায়ী, সরকার ও জনগণ মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে ২০২৬-২০২৭ সালে অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার সম্ভব।
মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন বলেন, জাতি হিসেবে আমরা রেজিলিয়েন্ট। নির্বাচিত সরকার, ব্যবসায়ী ও জনগণ একত্রে কাজ করলে এক-দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি সামনের দিকে এগোতে পারবে।
নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রফতানি খাতে ধীরগতিশীলতা কাটানো সম্ভব। তবে পূর্ণ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হতে কমপক্ষে ৩-৫ বছর সময় লাগতে পারে।





































