নিম্নমানের চাল সংগ্রহের অভিযোগে ঠাকুরগাঁওয়ে খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা বরখাস্ত
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে আমন চালের পরিবর্তে পুরাতন হাইব্রিড চাল, নন শর্টার ও নিম্নমানের পুরাতন চাল সংগ্রহের অভিযোগে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া সরকারি খাদ্য গুদামের খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শিপ্রা শীলকে স্ট্যান্ড রিলিজ ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) খাদ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফিফ-আল-মাহমুদ ভূঁঞার স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯ ধারা (০১) উপধারা অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একইসঙ্গে প্রশাসনিক কারণে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) তাকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) করে পরবর্তী পদায়নের জন্য আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক, রংপুরের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছে। এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জিয়াউল হক শাহ।
খাদ্য অধিদপ্তরের আদেশে বলা হয়, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অভ্যন্তরীণ আমন সংগ্রহ মৌসুমে রুহিয়া এলএসডিতে আমন চালের পরিবর্তে পুরাতন হাইব্রিড চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া, কয়েকটি খামালে কিছু বস্তা স্টেনসিলবিহীন এবং কিছু বস্তায় আমন সংগ্রহ/২০২৪-২৫ অর্থবছরের স্টেনসিলযুক্ত বস্তায় চাল রাখা হয়। পাশাপাশি নন শর্টার ও বিনির্দেশ বহির্ভূত নিম্নমানের পুরাতন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সরকার নির্ধারিত সংগ্রহ নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়। বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি মোতাবেক জীবনধারণ ভাতা প্রাপ্য হবেন।
এদিকে রুহিয়া এলএসডির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখতে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শিবগঞ্জ এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
এর আগে, গত মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত ঠাকুরগাঁও জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আজমির শরিফ মারজীর নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট টিম রুহিয়া সরকারি খাদ্য গুদামে অভিযান চালায়। অভিযানে সরকার নির্ধারিত নীতিমালা লঙ্ঘন করে ঘুষের বিনিময়ে নিম্নমানের ধান ও চাল সংগ্রহের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়।
অভিযানকালে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংগৃহীত চালের মান পরীক্ষার জন্য ১৪টি পৃথক খামাল থেকে সিলগালা করা ব্যাগে ১০০ গ্রাম করে চালের নমুনা সংগ্রহ করে ইনভেন্টরি করা হয়। একইসঙ্গে খাদ্য গুদামের সব গুদামঘর পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র জব্দ করে দুদক টিম।
এ সময় ৭ নম্বর গুদামের খামাল নম্বর ৩-এ কোনো রেকর্ডপত্র ছাড়াই ৩ হাজার ৪৫০ কেজি চাল পাওয়া যায়। এসব চালের বিষয়ে খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন। পরে তিনজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে মালিকবিহীন চাল ইনভেন্টরি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেয় দুদক। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হলেও তিনি তা দিতে পারেননি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে এক দিনের মধ্যে রুহিয়া খাদ্য গুদাম ত্যাগ করে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক, রংপুর কার্যালয়ে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জিয়াউল হক শাহ বলেন, দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের অভিযানের পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আজমির শরিফ মারজী বলেন, প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে রুহিয়া সরকারি খাদ্য গুদামে একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় গুদামের সব কটি স্টোররুম, খামাল ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হয়। সরকার নির্ধারিত সংগ্রহ নীতিমালা অনুযায়ী আমন চাল সংগ্রহ হচ্ছে কি না, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে পরীক্ষা করি। অভিযানকালে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আওতায় সংগৃহীত চালের মান যাচাইয়ের জন্য ১৪টি পৃথক খামাল থেকে সিলগালা করা ব্যাগে চালের নমুনা সংগ্রহ করে ইনভেন্টরি করা হয়েছে। এসব নমুনা পরবর্তী সময়ে ল্যাব পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পাশাপাশি বস্তা গণনা ও নথিপত্র মিলিয়ে দেখার সময় একটি গুদামে কোনো ধরনের রেকর্ডপত্র ছাড়া উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল মজুতের বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।





































