২০২৪ সালে সম্পন্ন জাতীয় স্বাস্থ্য ও আঘাত জরিপের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিদিন ৫১ জনের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান এবং তাঁদের ৭৫ শতাংশের বেশি শিশু। জরিপ অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৪০ শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়। ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও ডুবে যাওয়া।
এই চিত্রের পেছনে বাংলাদেশের বসতবাড়ির পরিবেশ বড় কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক বিশ্লেষণ বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বেশির ভাগ পানিতে ডুবে মারা যায় বাড়ির ২০ মিটারের মধ্যে। পুকুর, খাল, ডোবা এবং পানিভর্তি বিভিন্ন পাত্র এ ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করে। কম বয়সী শিশুকে সারাক্ষণ নজরদারিতে রাখা সম্ভব না হওয়া এবং পানির আশপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ায়।
তবে শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে দুর্ঘটনার ধরনও বদলে যায়। পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা রয়েছে। শিশুদের শারীরিক গঠন, চলন্ত গাড়ির গতি ও দূরত্ব বিচার করতে না পারা এবং রাস্তা পারাপারে অভিজ্ঞতার অভাব এ ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বাস্থ্য ও আঘাত জরিপেও সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ৪ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে প্রায় ২৪ হাজার ২৩৩ জনের মৃত্যু হচ্ছে। এই হিসাব সব বয়সী মানুষের হলেও শিশু-কিশোরদের জন্য সড়ক যে বড় ঝুঁকির জায়গা, তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় স্পষ্ট।
শিশুদের দুর্ঘটনার আরেকটি বড় অংশ ঘটে ঘরেই। বাংলাদেশে শিশুদের দুর্ঘটনা নিয়ে বৃহৎ পরিসরের একটি জাতীয় জরিপে দেখা যায়, দুর্ঘটনাজনিত আঘাতের মধ্যে পড়ে যাওয়া ছিল সবচেয়ে বেশি—মোট আঘাতের ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর ছিল দগ্ধ হওয়া ১৮ দশমিক ২ শতাংশ, ধারালো বস্তুতে কেটে যাওয়া ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সড়ক দুর্ঘটনা ১২ দশমিক ১ শতাংশ।
পড়ে যাওয়ার ঘটনা বিশেষ করে ছোট শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা শেখার সময় ভারসাম্য ধরে রাখতে না পারা, সিঁড়ি বা উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যাওয়া এবং ঘরের ভেতর অনিরাপদ পরিবেশ এ ধরনের দুর্ঘটনার কারণ। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাটি গুরুতর না হলেও মাথায় আঘাত, হাড় ভাঙা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
দগ্ধ হওয়ার ঘটনাও শিশুদের জন্য বড় বিপদ। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও আঘাত জরিপ ২০১৬-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, শিশুদের অপ্রাণঘাতী আঘাতের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল পোড়ার ঘটনা। ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এ ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ছিল। রান্নার চুলা, গরম পানি, গরম তরল ও আগুনের সহজ নাগাল এর অন্যতম কারণ।
এর বাইরে বিষক্রিয়া, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, প্রাণীর কামড় এবং ধারালো জিনিসে কেটে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে ছোট শিশুরা বিপদের মাত্রা বুঝতে না পারায় ওষুধ, রাসায়নিক দ্রব্য বা অন্য কোনো ক্ষতিকর বস্তু মুখে দিয়ে ফেলতে পারে।
তবে শিশুদের দুর্ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—ঝুঁকির ধরন বয়সের সঙ্গে বদলায়। ১ থেকে ৪ বছর বয়সে পানিতে ডুবে যাওয়া এবং ঘরের ভেতরের দুর্ঘটনা বড় ঝুঁকি; বয়স বাড়ার সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। অর্থাৎ শিশুর বয়স অনুযায়ী দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থাও আলাদা হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়া ঠেকাতে জাতীয় কৌশল থাকলেও এর বাস্তবায়ন, সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা ও নিয়মিত নজরদারিতে এখনো ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫–২০৩০ সালের জাতীয় ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ কৌশলে কমিউনিটি শিশুযত্নকেন্দ্র, সাঁতার ও জীবনরক্ষার প্রশিক্ষণ এবং উদ্ধারকারী প্রশিক্ষণের মতো উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
শিশুর দুর্ঘটনা কমাতে তাই শুধু দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বাড়ির পাশে পানির উৎস নিরাপদ করা, ছোট শিশুদের জন্য নিরাপদ শিশুযত্নের ব্যবস্থা, রান্নাঘর ও বৈদ্যুতিক সংযোগ নিরাপদ করা এবং স্কুলপথ ও সড়কে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—সবগুলো ব্যবস্থাই একসঙ্গে প্রয়োজন। কারণ পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো, শিশুর ঝুঁকি অনেক সময় কোনো দূরের বিপজ্জনক জায়গায় নয়; বাড়ির পাশের পুকুর, ঘরের রান্নাঘর কিংবা প্রতিদিন পার হওয়া রাস্তাতেই।