প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেনেথ এম. পোলাকের এক বিশ্লেষণে এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী এবং রূপান্তরমূলক প্রভাবগুলো বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
তাঁর মতে, এই সংঘাতের দৃশ্যমান ফলাফলগুলোর আড়ালে এমন কিছু প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, যা আধুনিক ভূরাজনীতির প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে।
প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অসম যুদ্ধের অর্থনীতি
যুদ্ধের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো, আধুনিক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যতই কার্যকর হোক না কেন, তা নিরঙ্কুশ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর তৈরি ইন্টারসেপ্টর ইরানের ড্রোন, ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সফল হলেও, এর গভীরে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্য।
আক্রমণকারী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত সস্তায় তৈরি করা যায়। অন্যদিকে, সেগুলো প্রতিহত করতে আত্মরক্ষাকারীকে মিলিয়ন ডলারের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়। যদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ৯০ ভাগ আক্রমণ ঠেকাতেও সক্ষম হয়, অবশিষ্ট ১০ ভাগের আঘাত অর্থনীতি ও সমাজে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা-চিন্তায় পালাবদল
ইসরায়েলের মতো দেশ দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অভিজ্ঞতার কারণে আক্রমণের ধাক্কা সামলাতে পারলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার) পরিস্থিতি ভিন্ন। তাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো স্থিতিশীলতা, জ্বালানি উৎপাদন, বাণিজ্য ও পর্যটন। নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা তাদের অর্থনৈতিক মডেলকে ভেঙে দিতে পারে।
আগে উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং ইসরায়েলের সম্পর্ক তাদের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই হিসাব বদলে দিয়েছে। ইরান এখন বুঝতে পারছে যে, সরাসরি মার্কিন হামলার শিকার না হয়েও কেবল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা এবং ড্রোন হামলার হুমকি দিয়ে গোটা বিশ্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
এই বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলো কেবল প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা (যেমন: ড্রোন উৎপাদন) বাড়াতে আগ্রহী হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দিতে পারে।
চীনের সামরিক উপস্থিতির নতুন সমীকরণ
পোলাকের বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ভূমিকার সম্ভাব্য পরিবর্তন। গত চার দশক ধরে চীন মধ্যপ্রাচ্যে এক ধরনের ‘ফ্রি-রাইডার’ বা সুবিধাভোগী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তারা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা নিলেও আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধেই ছেড়ে রেখেছিল।
কিন্তু চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ এবং এর প্রায় ৫০ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। এই অঞ্চলের সঙ্গে চীনের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
বর্তমান সংঘাত চীনের জ্বালানি ও বাণিজ্য রুটকে হুমকির মুখে ফেলায় বেইজিং এখন ভাবতে বাধ্য হচ্ছে যে, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় তাদের আরও প্রত্যক্ষ সামরিক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে কি না। যদি চীন ভারত মহাসাগর ও আরব সাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
ইরানের নতুন নেতৃত্ব ও পারমাণবিক সক্ষমতার জেদ
যুদ্ধের প্রাথমিক হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যুর পর যারা নেতৃত্বে এসেছেন, পোলাকের মতে তারা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও ঝুঁকি নিতে আগ্রহী। এই নেতৃত্ব মনে করে, শুধু ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণ ঠেকানোর একমাত্র গ্যারান্টি।
যুদ্ধের কারণে সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরান রাশিয়া ও চীনের সহায়তায় নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার পুনর্গঠন করছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে চাপ প্রয়োগের কার্যকারিতা সম্পর্কে তেহরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। ফলে সামরিকভাবে দুর্বল হলেও কৌশলগতভাবে ইরান আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।
উপসংহার
কেনেথ এম. পোলাকের এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে, ইরান যুদ্ধের ফলাফল কেবল ধ্বংস হওয়া অস্ত্র বা স্থাপনার হিসাব দিয়ে বিচার করা যাবে না। ড্রোন-অর্থনীতি, উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন সমীকরণ, চীনের সম্ভাব্য সামরিক অনুপ্রবেশ এবং ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে। পরিবর্তনের এই লক্ষণগুলো এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।