মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। তার আগে সকাল ৮টা থেকেই চন্দ্রা বাইপাসে রাস্তা আটকে অবস্থান শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। চন্দ্রা, কোনাবাড়ী এবং পল্লী বিদ্যুৎ এলাকাতেও অবরোধ ও বিক্ষোভের খবর মিলেছে। শিল্পাঞ্চলের একাধিক জায়গায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহণে বিঘ্ন ঘটেছে।
আশুলিয়াতেও ছবিটা প্রায় একই। বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। বিক্ষোভকারীদের সরাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। পাল্টা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। এর আগে আশুলিয়ার একটি এলাকায় কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
কারখানা খুলেও অশান্তি, ফের ছুটির ঘোষণা
মঙ্গলবার সকালে আশুলিয়ার নরসিংহপুর-সহ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে অধিকাংশ কারখানা খুলেছিল। বহু শ্রমিক কাজে যোগও দেন। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি জায়গায় ফের উত্তেজনা ছড়ায়। সংঘর্ষ ও নিরাপত্তার পরিস্থিতি বিবেচনা করে আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ছুটির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু কারখানার শ্রমিক আবার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন।
এর আগে সোমবারও গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়ায় বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। শিল্পপুলিশ জানিয়েছে, শ্রমিক অসন্তোষের জেরে ওই দিন দুই শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৪১৪টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। তার মধ্যে আশুলিয়ার ২৬৪টি এবং গাজীপুরের অন্তত ১৫০টি কারখানা রয়েছে।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বেলা সাড়ে ৩টে পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, আশুলিয়া, জিলানি এবং নারায়ণগঞ্জের ৬৭৯টি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ না করে বেরিয়ে যান। এর মধ্যে গাজীপুর ও ময়মনসিংহে ৩৮২টি, আশুলিয়া ও জিলানিতে ২২৩টি, মিরপুরে ৬৫টি এবং নারায়ণগঞ্জে ৯টি কারখানা রয়েছে। রবিবারও ৫২৯টি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।
মিরপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ, ছড়িয়েছে বিক্ষোভ
শুধু গাজীপুর ও আশুলিয়ায় নয়, ঢাকার মিরপুর এবং নারায়ণগঞ্জেও শ্রমিক বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে। সোমবার সকালে মিরপুর ১০, ১১ ও ১২, পল্লবী এবং কাফরুল এলাকায় শ্রমিকদের ছোট ছোট দলে জমায়েত হতে দেখা যায়। মিরপুর ১০-এ সকাল সোয়া ৯টার দিকে শ্রমিকেরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। তাঁদের সরাতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। কয়েক জন বিক্ষোভকারী-সহ বেশ কয়েক জনকে আটকও করা হয়।
মিরপুর-পল্লবী-কাফরুল এলাকার একাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলেও কল্যাণপুরের কয়েকটি কারখানা চালু ছিল। অন্য দিকে, মিরপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের প্রতিবাদে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের কর্মীদের মিছিল করতেও দেখা যায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, রবিবারের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। রবিবার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত অন্তত ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে সোমবার দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় রাস্তা আটকে বিক্ষোভ দেখান শ্রমিকেরা। প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধ চলার পর পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
তিন মামলায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি অভিযুক্ত
গাজীপুরে সোমবারের অশান্তির ঘটনায় পুলিশের গাড়িতে আগুন, ভাঙচুর এবং অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগে কোনাবাড়ী, বাসন ও কালিয়াকৈর থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, ওই তিন মামলায় প্রায় ৩,৬০০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। রবিবারের ঘটনার পর আরও দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেগুলিতে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩২ জনকে গ্রেফতার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
সচিবালয়ে বৈঠক, আন্দোলনে ‘তৃতীয় পক্ষের’ অভিযোগ
এই পরিস্থিতিতে রবিবার রাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। শ্রমিকদের কাজে ফেরানোর পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। রবিবারই পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। তার পরেও আন্দোলন থামেনি।
সোমবার সচিবালয়ে পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন-সহ সরকারি প্রতিনিধিরা। বৈঠকের পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, কিছু রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন শিল্পমালিক এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাক্তন সাংসদ, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একাংশ এই অস্থিরতার পিছনে রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এ বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সমর্থন মেলেনি।
পরে শ্রমিক সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক হয়। মজুরি বোর্ডের সদস্য ও শ্রমিক নেতা বাবুল আখতার অভিযোগ করেন, শ্রমিক পরিচয় দিয়ে কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছেন। শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্ররোচনায় পা না দিতে। বৈঠকে শ্রমিক প্রতিনিধিরা কার্যকর ট্রেড ইউনিয়নের অভাবের কথাও তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, সেই সুযোগে তৃতীয় পক্ষ আন্দোলনকে প্রভাবিত করছে।
তবে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাস্তায় নামা শ্রমিকদের অসন্তোষ যে এখনও কাটেনি, মঙ্গলবারের অবরোধই তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মজুরি বোর্ড গঠনের পরেও শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক কাজকর্ম ফেরেনি। প্রশাসনের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—এক দিকে সড়ক ও কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্য দিকে শ্রমিকদের দাবিকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনা প্রশমিত করা।