পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। নিজের বাড়িঘর বিক্রি করে দীর্ঘদিন কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জয়নগর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন তিনি। পেশায় অটোরিকশাচালক সুমন নিয়মিত গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, মাদকসেবনের জন্য শ্বশুরবাড়ির দামি আসবাব বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে সুমনের বিরুদ্ধে। একপর্যায়ে তাঁর স্ত্রী মামলা করেন এবং সন্তান নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন। এর পর সুমন বিভিন্ন জায়গায় থাকতেন। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে তিনি শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান।
ঘটনার সময়ক্রম তুলে ধরে পুলিশ জানায়, বুধবার, ৭ অক্টোবর রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরে ওই শিক্ষার্থী। পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় বাস থেকে নেমে বাড়ি যাওয়ার জন্য ৩০০ টাকায় সুমনের অটোরিকশা ভাড়া করে সে। পুলিশের অভিযোগ, শহরের দিকে যাওয়ার পরিবর্তে চালক তাকে লালমাইয়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যান।
তদন্ত ও সুমনের বক্তব্যের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, কিশোরীটি পালানোর চেষ্টা করলে তাকে ধরে ফেলেন সুমন। সেখানে তার ওপর যৌন সহিংসতা চালানো এবং শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। পরে কিশোরীর ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান তিনি বলে পুলিশের দাবি।
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর তার বাবা লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্তে কিশোরীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কলতথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লার একটি জঙ্গল থেকে কিশোরীর আইফোন উদ্ধার করা হয়।
শনিবার, ১০ অক্টোবর কুমিল্লার আদালতে বিচারক মমিনুল হকের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সুমন। আদালতের পুলিশ পরিদর্শক সাদেকুর রহমান জানান, তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে ওই দিন সন্ধ্যায় তাঁকে কুমিল্লা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
ধর্ষণের অভিযোগ নিশ্চিত করতে কিশোরীর পোশাক ও জৈবিক নমুনা সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোমবার, ১২ অক্টোবর মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা ও লালমাই থানার উপপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল ফারুক জানান, এসব আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠানোর অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। মোবাইল ফোনটিও ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ রয়েছে।
লালমাই থানার ওসি মো. মিজানুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, সুমনের মাদকসেবনসহ আগের কর্মকাণ্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তাঁর পারিবারিক বিরোধ ও মাদকসেবনের অভিযোগও পুলিশের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সামনে এসেছে।
এদিকে তদন্তে আলোচনায় আসা কক্সবাজারের হোটেলকর্মী রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু চৌধুরীকে রোববার, ১১ অক্টোবর আটক করা হয়। সোমবার তাঁকে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে কুমিল্লা ডিবি। পরে কক্সবাজার সদর থানার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ওই সন্ধ্যায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, রাজুকে কুমিল্লায় আনা হয়নি, কক্সবাজারেই তদন্তসংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয় যাচাই করতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো নিশ্চিত নয়। কিশোরীর সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য যাচাই করতেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।