গাঁজা, হেরোইন আর ইয়াবা বিক্রির পাশাপাশি মাত্র ২০ টাকার বিনিময়ে মাদক সেবনের ‘নিরাপদ’ ঘর বা ‘গাপ্পা’ তৈরির অভিনব বন্দোবস্ত করেছে কারবারিরা। স্থানীয় অনেকের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এখানে মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সদ্য পদত্যাগ করা মুক্তিযুদ্ধ বিষয় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অভিযানে জনমনে স্বস্তি এনেছিল।
কিন্তু প্রকাশ্যে তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযানে আসায় তা সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি পদত্যাগ করেন। নেটিজেন ও স্থানীয় অনেকের মতে, ঘুণ্টিঘর ইস্যুতে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগে মাদত কারবারিদের হাত শক্তিশালী হয়েছে। চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
২০ টাকায় সেবনের ঘর ও অস্ত্রধারী পাহারা
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুর থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দয়াগঞ্জ রেলগেট থেকে ঘুণ্টিঘর এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক ভয়ঙ্কর চিত্র। রেললাইনের পশ্চিম পাশের ফাঁকা জায়গায় ৫০ থেকে ৬০ জনের জটলা। কারও হাতে গাঁজার পুরিয়া, কেউবা ব্যস্ত হেরোইন ও ইয়াবার দর-কষাকষিতে। ফাঁকা জায়গার দেয়াল ঘেঁষে অস্থায়ী কাগজের ছাউনিতে বসে দেদারছে মাদক সেবন করছেন আসক্তি প্রার্থীরা।
স্থানীয় এক পরিবহন শ্রমিকের তথ্য মতে, ২৫০ টাকায় একটি ইয়াবা কিনে নির্দিষ্ট ওই ‘গাপ্পা’ ঘরে বসে খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত ২০ টাকা দিতে হয়। মাদক কিনে নিরাপদে রেলগেট পর্যন্ত পৌঁছানো যায়, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো বাধা থাকে না।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদক কারবারিদের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী লাঠি, চাপাতি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়। বিগত দিনে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দিতে গেলে তাদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গত ডিসেম্বরেও কারবারিদের পাথরের আঘাতে দুই পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই সাম্রাজ্য?
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী, ৩৬৩ জন শীর্ষ মাদক কারবারির মধ্যে ঘুণ্টিঘর এলাকার নামাপাড়া রেললাইন বস্তি নিয়ন্ত্রণ করেন রহিমা নামের এক নারী, যার স্বামী হযরত স্থানীয় ‘বেলবাট্টি গ্রুপের’ প্রধান। পাশের ডিস্টিলারি রোডের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মনিরুল হক রবিন ও মিনুর হাতে।
এছাড়া রানা ওরফে পিচ্চি রানা, সবিজুল ইসলাম সজিব, গোলাম মোস্তফা বিকাশ এবং মিলন ওরফে ল্যাংড়া মিলনের নামও উঠে এসেছে বিভিন্ন এলাকার কারবার নিয়ন্ত্রক হিসেবে। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মূলহোতারা পর্দার আড়ালে থাকলেও তাদের পেটোয়া বাহিনী ও খুচরা বিক্রেতারা পুরো এলাকাকে জিম্মি করে রেখেছে।
অভিযান এবং চক্রের স্থায়ী রূপ
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা দক্ষিণ বিভাগ ও এসআরবি-৩ এর যৌথ উদ্যোগে ঘুণ্টিঘর এলাকায় পরিচালিত হয় সাঁড়াশি অভিযান। ছদ্মবেশে পরিচালিত এই অভিযানে দুই নারীসহ ১৫ জনকে আটক করা হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে তিন মাসের কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের আক্ষেপ, অভিযানে যাঁদের আটক করা হয় তাঁরা মূলত দিনমজর বা খুচরা বিক্রেতা। মূল অপরাধী ও গডফাদাররা বরাবরই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ডিএনসির ঢাকা দক্ষিণ বিভাগের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন স্বীকার করেছেন যে এসব ভাসমান কারবারিরা অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার ফিরে আসে।
এর সত্যতাও মিলল হাতেনাতে। সোমবার (১৯ অক্টোবর)) বিকেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও সাজা ঘোষণা শেষে যৌথ বাহিনী এলাকা ছাড়ার মাত্র কিছুক্ষণ বাদেই ফের পুরোনো রূপে ফিরে আসে ঘুণ্টিঘর। রেললাইনের ধারে বসে মাদকসেবীরা আবারও গাঁজা টানতে শুরু করে, যা স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
নতুন মাত্রা ও নাগরিক উদ্বেগ
মাদক কারবারের এই অবাধ বিস্তার কেবল গেণ্ডারিয়ার সামাজিক পরিবেশকেই নষ্ট করছে না, বরং উঠতি বয়সী তরুণ প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে। স্থানীয় নারী ও অভিভাবকদের দাবি, সাময়িক ঝটিকা অভিযান দিয়ে এই অপরাধ দমন অসম্ভব। ঘুণ্টিঘর ও এর আশপাশের এলাকাকে স্থায়ীভাবে মাদকমুক্ত করতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
১. স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন: রেললাইনসংলগ্ন স্পটগুলোতে সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা বা স্থায়ী ক্যাম্প বসানো।
২. গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা: কেবল খুচরা বিক্রেতা নয়, তালিকাভুক্ত মূল কারবারি ও গডফাদারদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
৩. সামাজিক সচেতনতা ও পুনর্বাসন: মাদকাসক্ত তরুণদের চিকিৎসার পাশাপাশি স্থানীয় যুবসমাজকে খেলাধুলা ও গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্ত করা।
গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর আজ এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক বিতর্ক ছাপিয়ে এই জনপদের সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে প্রয়োজন কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। খবর: নবোদয়