গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর আগে, গত সেপ্টেম্বরে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কাছে প্রায় আড়াই হাজার কারাবন্দি ও আটক বাংলাদেশির একটি তালিকা পাঠিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। ওই তালিকায় নজরুল ও সুইটির নাম থাকলেও, তাদের মামলার চূড়ান্ত রায় বা মৃত্যুদণ্ডের সাজার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিল না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেদ্দা কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা জানান, বশির ও সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কনস্যুলেট তালিকাটি পুনরায় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। সেখানে আরও ২০ জন বাংলাদেশির নামের পাশে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা পাওয়া যায়, তবে তাদের সাজার কোনো বিস্তারিত বিবরণ নেই। সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করায় বন্দির সংখ্যাও আনুপাতিক হারে বেশি। দণ্ডের ধরন অনুযায়ী কনস্যুলার সেবার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়, কিন্তু রায়ের সার-সংক্ষেপ না থাকায় তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কনস্যুলেটের তৎপরতা ও বন্দিদের পরিসংখ্যান
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ২০ অক্টোবর জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা আঞ্চলিক শাখায় একটি কূটনৈতিক চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। চিঠিতে সদ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুজনসহ মোট ২২ বাংলাদেশির মামলার রায় ও দণ্ডের বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া অসম্পূর্ণ তালিকা অনুযায়ী, এই ২২ জনের মধ্যে আটজন হত্যা, পাঁচজন মাদক পাচার, পাঁচজন ব্যক্তিগত পাওনা বা অধিকার ক্ষুণ্ন করা সংক্রান্ত, দুজন রাষ্ট্রদ্রোহ বা রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন, একজন সাইবার অপরাধ এবং একজন ব্যভিচারের অভিযোগে বিচারাধীন বা দণ্ডপ্রাপ্ত। এসব বন্দি জেদ্দার জাব্বান কারাগার, শুমাইসি, জেদ্দা জেনারেল প্রিজন, নাজরান, খামিস, আল-বাহা, হাদ্দা ও জেদ্দার নারী কারাগারে বন্দী রয়েছেন।
এই চিঠির পাশাপাশি, একই দিনে পাঠানো পৃথক এক চিঠিতে বন্দিদের মুক্তি ও ক্ষমার আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। যাদের সাজা শেষ হয়েছে তাদের দ্রুত দেশে ফেরানো, লঘু অপরাধী ও প্রথমবার আটক হওয়া ব্যক্তিদের সাধারণ ক্ষমা এবং ভালো আচরণের শর্তে অনেকের বাকি সাজা মওকুফের অনুরোধ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ: ‘আইনজীবী কনসাল’ নিয়োগের তাগিদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান এই পরিস্থিতিকে কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, বিদেশি নাগরিক আটকের ক্ষেত্রে ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস’-এর ৩৬ ও ৩৭ অনুচ্ছেদে কনস্যুলার যোগাযোগের বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর যোগাযোগের এমন ঘাটতি থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশকে ঔপনিবেশিক আমলের অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদায়নের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রবাসীদের কল্যাণে সত্যই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে সৌদি আরবের স্থানীয় শ্রম ও ফৌজদারি আইনে অভিজ্ঞ ‘আইনজীবী কনসাল’ পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত।"
অধ্যাপক শাহাব এনাম জানান, ভাষাগত অদক্ষতার কারণে আটক ব্যক্তিরা আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেন না। তাই অবিলম্বে প্রবাসীদের সহায়তার জন্য একটি ‘আইনি অর্থায়ন তহবিল’ গঠন করা জরুরি।
মৃত্যুদণ্ডের পরিসংখ্যান
ইউরোপভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস’ (ইএসওএইচআর)-এর ২০২২ সালের 'ব্লাডশেড অ্যান্ড লাইস' শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরবে অন্তত ১৬ জন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সংস্থাটির ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে আরও এক বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য মেলে। ১৪ অক্টোবরের সর্বশেষ দুজনসহ গত ১৬ বছরে সৌদিতে অন্তত ১৯ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো।
ইএসওএইচআর-এর তথ্যমতে, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরব মোট ১,২৪৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, যার মধ্যে ৪৯০ জনই বিদেশি নাগরিক। বিদেশিদের মধ্যে সর্বাধিক ছিলেন পাকিস্তানি (১৬৪ জন)। এরপর পর্যায়ক্রমে ইয়েমেনি ৯২, সিরীয় ৫৮, মিশরীয় ২৬, জর্ডানি ২৫, নাইজেরীয় ১৭, ইথিওপীয় ১৫ এবং চাদের ১৪ জন নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।