প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। এবার হাসনাতের সেই সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর যমজ ভাই ও বিএনপি নেতা মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ।
বিরোধের সূত্রপাত: গোয়েন্দা তথ্য নাকি ‘আওয়ামী স্টাইল’?
রাজশাহীর জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টিতে পলাতক স্বৈরাচার বিপুল পরিমাণ অর্থ সরবরাহ করছে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনের আগে বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধা পেতে কয়েকটি বিরোধী দলও এতে গোপনে ইন্ধন দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকার বনাম এনসিপির মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারও হাসিনা সরকারের মতো বিরোধী দলগুলোর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালাচ্ছে।
হাসনাতের ভাষ্য: "রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে দিয়ে বিরোধী দলের ওপরে গোয়েন্দাগিরি করার যে বার্তা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিরোধী দলের ওপর গোয়েন্দা সংস্থা লেলিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি আমাদের শেখ হাসিনার আমলের কথাই মনে করিয়ে দেয়।"
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী কোনো সরকারি দলের সম্পদ নয়, তারা জনগণের সেবক।
হাসনাতকে স্নিগ্ধর জবাব: ‘পুরাতন ন্যারেটিভ ছড়াবেন না’
হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে ফেসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও বর্তমানে বিএনপিতে যোগ দেওয়া মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ।
স্নিগ্ধ প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো ষড়যন্ত্র সত্যি ঘটছে কি না তা খতিয়ে দেখার চেয়ে হাসনাতের কাছে বর্তমান সরকারকে 'আওয়ামী লীগ' আখ্যা দেওয়া কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?
স্নিগ্ধ লেখেন, "প্রধানমন্ত্রী গোয়েন্দা তথ্যের যে কথা বলেছেন, সেটির সত্যতা খতিয়ে দেখা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের জন্যই জরুরি। কিন্তু হাসনাত ভাইয়ের দীর্ঘ পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সত্যতা নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ নেই। তিনি চেষ্টা করেছেন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকে বিগত আমলের গুম, খুন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের সঙ্গে তুলনা করতে।"
তিনি হাসনাতকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, সবসময় প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনাকে বর্তমান সরকার বনাম আওয়ামী লীগ বা সরকার বনাম বিরোধী দলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা আড়ালে পড়ে যাবে। স্নিগ্ধ আকুতি জানান, "রাজনীতি অবশ্যই কৌশলের খেলা। কিন্তু সেই খেলায় মেতে উঠে নিজের সহযোদ্ধাদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না, প্লিজ।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন মাত্রা
বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে কাদা ছোড়াছুড়ি রাজনীতিকে অস্থির করে তুলতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বা ষড়যন্ত্র তৈরি হলে গোয়েন্দা তথ্য খতিয়ে দেখা যেকোনো নির্বাচিত সরকারের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বনাম রাজনৈতিক কৌশল: রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লবকে দলীয় ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার না করার তাগিদ দিচ্ছেন বুদ্ধিজীবীরা।
সহযোগিতার রাজনীতি: বিরোধী দলগুলোর দায়িত্ব সত্য উদঘাটনে সহায়তা করা, আবার সরকারের দায়িত্বও নিশ্চিত করা যেন গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে অপব্যবহার না করা হয়।
জুলাইয়ের চেতনা ও জাতীয় জবাবদিহিতা
স্নিগ্ধের বক্তব্যের মূল সুর ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল স্বপ্ন বাস্তবায়ন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দীর্ঘ মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুন ও ফ্যাসিবাদের বিচার নিশ্চিত করা বর্তমানের সবচেয়ে বড় জাতীয় দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলগুলোর অন্ধ আনুগত্য বা পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি যেন জুলাইয়ের শহীদদের ত্যাগকে খাটো না করে।
রাজশাহীর সেই বক্তব্য থেকে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক দ্বিমত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সহনশীলতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীন ন্যায়বিচারের দাবির মধ্যে একটি সুস্থ রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।