রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

এক্সক্লুসিভ

দীর্ঘ ডিউটির চাপ, স্থায়ী সেবাকাঠামোয় ঘাটতি

দীর্ঘ ডিউটির চাপ, স্থায়ী সেবাকাঠামোয় ঘাটতি

পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে বাহিনীর ভেতর থেকেই। সরকার হাসপাতাল আধুনিকায়নের আশ্বাস দিলেও চলতি বছরের প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও পূর্ণাঙ্গ সেবার ঘাটতি উঠে এসেছে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মধ্যে থাকা সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে সাম্প্রতিক গবেষণা।

২২ এপ্রিল গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশ সদস্যদের দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের কথা উঠে আসে। পুলিশ সপ্তাহ সামনে রেখে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও অতিরিক্ত কাজের ভাতা চাওয়ার কথাও জানানো হয়। ওই প্রতিবেদনে কর্মকর্তারা বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে মানসিক আঘাতের মুখোমুখি হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এরপর ১০ মে পুলিশ সপ্তাহের কল্যাণ সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতাল আধুনিকায়নের কথা বলেন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অধিক কর্মচাপ বিবেচনায় সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুযোগসুবিধা বাড়ানোর আশ্বাস দেন তিনি। ফলে বিষয়টি সরকারের ঘোষিত কল্যাণ কার্যক্রমের মধ্যেও স্থান পেয়েছে।

একই অনুষ্ঠানে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় পুলিশের যৌক্তিক দাবি পূরণের কথা বলেন মন্ত্রী। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার বিপরীতে ইন্সপেক্টর থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সদস্যদের ওভারটাইম ভাতা বিবেচনার কথাও জানান। কর্মঘণ্টা ও কাজের চাপকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করায় সমস্যাটির প্রশাসনিক দিকও তাঁর বক্তব্যে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে সময়সীমা ও বরাদ্দের প্রশ্নও রয়েছে।

কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজারবাগের কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে। একই প্রতিবেদনে ৫৯ জেলায় চিকিৎসাসুবিধা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কথা আসে। হাসপাতালের পরিচালক মো. সাইদুর রহমান স্থায়ী বিশেষজ্ঞ নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

২৩ এপ্রিল গণমাধ্যমে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে পুলিশ সদস্যরা জানান, দায়িত্ব পালনে এক পক্ষের সমস্যা মেটাতে গিয়ে অন্য পক্ষের অসন্তোষের মুখে পড়তে হয়। পাশাপাশি পরিবারের প্রত্যাশা মেলানোর চাপও রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক তৌহিদুল হক পেশাগত ও পারিবারিক চাপ মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞ সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

সেবার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সতর্কসংকেত দিয়েছে জানুয়ারিতে ময়মনসিংহ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা। আট বিভাগের ২৭ জেলার ৪১৩ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে গুরুতর থেকে অত্যন্ত গুরুতর বিষণ্নতার উপসর্গ পাওয়া যায় ২৯ দশমিক ৬ শতাংশের। উদ্বেগের ক্ষেত্রে হার ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মানসিক চাপের ক্ষেত্রে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ডিএএসএস–২১ প্রশ্নমালার মাধ্যমে এই উপসর্গ মূল্যায়ন করা হয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ সীমা রয়েছে: গবেষণাটি ২০২৬ সালে প্রকাশিত হলেও তথ্য সংগ্রহ হয়েছিল ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। অংশগ্রহণকারীদের দৈবচয়নের মাধ্যমে নেওয়া হয়নি। ফলে এসব হারকে পুরো বাহিনীর বর্তমান রোগের হার বলা যাবে না। প্রশ্নমালায় উপসর্গ শনাক্ত হওয়াও চিকিৎসকের রোগনির্ণয়ের সমান নয়। গবেষকেরা নিয়মিত মূল্যায়ন, পরামর্শসেবা ও সাংগঠনিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছেন।

মানসিক সুস্থতার আলোচনায় মৃত্যুর তথ্যও গুরুত্ব পাচ্ছে। গত জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন ইউনিটের বরাতে জানানো হয়, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ৬৫ সদস্য আত্মহত্যায় মারা গেছেন।একই প্রতিবেদনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আত্মহত্যা কোনো একটি কারণে ঘটে না; একাধিক কারণ মিলিত হয়। ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে পুলিশে নিয়মিত মানসিক চাপ নিরসনের ব্যবস্থা রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই ব্যাখ্যা কর্মপরিবেশ, পারিবারিক সংকট ও চিকিৎসার সুযোগকে একসঙ্গে বিবেচনার প্রয়োজন সামনে আনে।

সহায়তা কার্যকর হতে পারে কি না, সে বিষয়েও নতুন গবেষণা রয়েছে। এপ্রিলে হেলথকেয়ার সাময়িকীতে প্রকাশিত মেটা-বিশ্লেষণে ১০টি দৈবনিয়ন্ত্রিত গবেষণার ৬৩৭ পুলিশ সদস্যের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক সহায়তায় সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্যে মাঝারি মাত্রার উন্নতি পাওয়া যায়। তবে গবেষণাভেদে ফলের পার্থক্য ছিল যথেষ্ট। আঘাতপরবর্তী মানসিক চাপজনিত ব্যাধির ক্ষেত্রে সম্মিলিত ফল পরিসংখ্যানগতভাবে নিশ্চিত ছিল না।

ফেব্রুয়ারিতে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজিতে প্রকাশিত পর্যালোচনা বলছে, কর্মক্ষেত্রের চাপ অব্যাহত থাকলে ব্যক্তিগত সহনশক্তির প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। সহমর্মী নেতৃত্ব, সহকর্মীদের সহায়তা, কাজ ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য এবং সহজলভ্য মনস্তাত্ত্বিক সেবা একসঙ্গে প্রয়োজন। সেবা নিতে গেলে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকবে, এমন আস্থার পরিবেশ গড়ার কথাও এতে বলা হয়েছে।

এই পর্যালোচনায় আবেগ নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণকে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। তাই পুলিশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্ন সদস্যদের কল্যাণের পাশাপাশি নাগরিকদের সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে মানসিক সমস্যার উপসর্গ থাকলেই কোনো সদস্যকে সহিংস বা দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ধরে নেওয়ার ভিত্তি এসব গবেষণা দেয় না।

বাংলাদেশে এখন বাস্তবায়নের চিত্র স্পষ্ট করা জরুরি। কোথায় কতজন বিশেষজ্ঞ আছেন, সদস্যরা কত দ্রুত সেবা পান এবং চিকিৎসার তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকে। নিয়মিত মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের মাধ্যমে হাসপাতাল উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি বোঝা সম্ভব। প্রকাশিত গবেষণা ও প্রতিবেদনের মূল ইঙ্গিত, চিকিৎসার সুযোগের সঙ্গে কর্মপরিবেশের পরিবর্তন যুক্ত করেই পুলিশের মানসিক সুরক্ষার কাঠামো গড়তে হবে।

আরও

লিকেজে বাড়ছে দুর্ঘটনা, সিলিন্ডারের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

এক্সক্লুসিভ

লিকেজে বাড়ছে দুর্ঘটনা, সিলিন্ডারের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

নারায়ণগঞ্জে এক রাতে তিন স্থানে বিস্ফোরণে নয়জন দগ্ধ হওয়ার ঘটনা গ্যাস ব্যবহারের নিরাপত্তাকে আবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তবে...

২০২৬-১০-১০ ১২:১৫

শিশুদের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কোথায়?

এক্সক্লুসিভ

শিশুদের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কোথায়?

বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিশুর দূর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা বেশ বিস্তৃত। বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা বা খাল, রান্নাঘরের আগুন, গরম প...

২০২৬-০৯-২৩ ১৬:০৮

চিরকুট রহস্য: চাকরির সুপারিশ থেকে তদন্তের টেবিলে

এক্সক্লুসিভ

চিরকুট রহস্য: চাকরির সুপারিশ থেকে তদন্তের টেবিলে

রাজনীতির মঞ্চে কখনো বক্তৃতার ঝড় ওঠে, কখনো পোস্টারের হাসি শোভা পায়। আবার কখনো একটি চিরকুটই খুলে দেয় সম্পর্কের অন্দরমহলের...

২০২৬-০৯-২২ ১৭:২০

সরকারের ঋণ কমেনি, বদলেছে উৎস ও ঝুঁকির ধরন

এক্সক্লুসিভ

সরকারের ঋণ কমেনি, বদলেছে উৎস ও ঝুঁকির ধরন

সরকারের আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা এবং...

২০২৬-০৯-২১ ১৯:২৯

লাফিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু: ১৬ দিনেই ২১ হাজার ডেঙ্গু রোগী, মৃত্যু ৭৪

এক্সক্লুসিভ

লাফিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু: ১৬ দিনেই ২১ হাজার ডেঙ্গু রোগী, মৃত্যু ৭৪

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক গতিতে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজা...

২০২৬-০৯-১৬ ২২:০৪