বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

এক্সক্লুসিভ

৬০৮ কোটি টাকার ড্রোন প্রকল্প: জনগণ কী জানে, কী জানে না

৬০৮ কোটি টাকার ড্রোন প্রকল্প: জনগণ কী জানে, কী জানে না

দেশে সামরিক ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপনে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশনের (সিইটিসি) সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। প্রকল্পটির ব্যয় ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এতে শুধু কারখানা স্থাপন নয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশে ড্রোন তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার কথাও রয়েছে। কিন্তু এত বড় একটি প্রতিরক্ষা প্রকল্পে ঠিক কত টাকা কীভাবে খরচ হবে, প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত কী, আর চুক্তি বাস্তবায়নের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব প্রশ্নের কতটা উত্তর জনগণের সামনে আছে?

প্রকল্পে কী হচ্ছে, কত টাকা খরচ হবে
২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও চীনের সিইটিসির মধ্যে সরকারি পর্যায়ের (জি-টু-জি) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে ৬ জানুয়ারি প্রকল্প প্রস্তাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের তথ্য প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে।

১২ জানুয়ারি প্রকাশিত পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ব্যয় ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করার কথা কারখানা ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি আমদানি এবং স্থাপনের জন্য। বাকি অর্থ স্থানীয় খরচ, ঋণপত্র খোলা, মূল্য সংযোজন কর ও সুইফট চার্জের মতো খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনা প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে ৬৪৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা প্রস্তাব করেছিল। পরে আলোচনার মাধ্যমে মূল্য কমিয়ে প্রায় ৬০৮ কোটি টাকায় আনা হয়।

আইএসপিআরের ২৭ জানুয়ারির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজনের কারখানা স্থাপন করা হবে। প্রাথমিকভাবে মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘসময় উড়তে সক্ষম ড্রোন (এমএএলই) এবং উল্লম্বভাবে ওঠানামা করতে সক্ষম ড্রোন (ভিটিওএল) তৈরি ও সংযোজনের সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও যৌথ কারিগরি সহযোগিতা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের শর্ত
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত প্রকল্প প্রস্তাবে পাঁচটি শর্তের উল্লেখ আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, চলতি অর্থবছরের ব্যয় বিদ্যমান বরাদ্দের মধ্য থেকেই মেটাতে হবে। পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে বিমানবাহিনীর অনুমোদিত বাজেটসীমার মধ্যে অর্থের সংস্থান করতে হবে। অর্থ পরিশোধ প্রচলিত আর্থিক বিধি মেনে ঋণপত্রের মাধ্যমে করতে হবে এবং অনুমোদিত অর্থ নির্ধারিত প্রকল্প ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যয় করা যাবে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা চার অর্থবছরে পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ১০৬ কোটি, পরবর্তী দুই অর্থবছরে ১৫৫ কোটি করে এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রায় ১৫৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়।

এসব শর্ত প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আর চুক্তির পূর্ণ শর্ত এক বিষয় নয়। অনুমোদনে অর্থ কীভাবে খরচ হবে, তার কাঠামো থাকতে পারে। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কী দিতে বাধ্য, কাজ শেষ করতে কত সময় পাবে, বিলম্ব হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিংবা প্রযুক্তি হস্তান্তরের পর বাংলাদেশ কতটা স্বাধীনভাবে ড্রোন তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে—এসব জানতে চুক্তির বিস্তারিত প্রয়োজন।

চুক্তির কোন তথ্যগুলো এখনো স্পষ্ট নয়
আইএসপিআরের প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তিতে চুক্তির উদ্দেশ্য ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার কথা থাকলেও পূর্ণ চুক্তিপত্র প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিতভাবে দেওয়া যাচ্ছে না।

প্রথমত, প্রযুক্তি হস্তান্তর বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে? বাংলাদেশ কি শুধু যন্ত্রাংশ সংযোজন করতে পারবে, নাকি ধাপে ধাপে নিজস্বভাবে ড্রোনের নকশা, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন করার সক্ষমতাও অর্জন করবে? প্রযুক্তি হস্তান্তরের পর কোন কোন ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি বা সহায়তা প্রয়োজন হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, কারখানা স্থাপনের সময়সীমা কত? নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিধান আছে কি? উৎপাদিত ড্রোনের গুণগত মান, ওয়ারেন্টি, যন্ত্রাংশের সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের দায় কার ওপর থাকবে?

তৃতীয়ত, প্রকল্পের ব্যয় বাড়লে সেই অতিরিক্ত অর্থ কে বহন করবে? চুক্তি বাতিল করতে হলে কী শর্ত প্রযোজ্য হবে? বিরোধ দেখা দিলে তা কোন প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্য তথ্য থেকে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই চুক্তিতে এসব শর্ত নেই বা সবকিছু নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত হয়েছে ধরে নেওয়া যায় না।

জাতীয় নিরাপত্তা কি সব তথ্য গোপন রাখার কারণ
সামরিক সরঞ্জাম কেনা বা উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিছু তথ্য গোপন রাখা যৌক্তিক হতে পারে। ড্রোনের নির্দিষ্ট সক্ষমতা, অপারেশনাল সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগব্যবস্থা বা সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত তথ্য প্রকাশ করলে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কিন্তু একটি প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সব তথ্য একই ধরনের সংবেদনশীল নয়।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ৭ ধারায় এমন কিছু তথ্য প্রকাশ না করার সুযোগ রয়েছে, যেগুলো প্রকাশ করলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অখণ্ডতা বা সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট তথ্যের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম রয়েছে।

তবে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দিয়ে প্রকল্পের প্রতিটি আর্থিক তথ্য গোপন রাখতেই হবে—আইনটি এমন কথা বলে না। নির্দিষ্ট সামরিক প্রযুক্তির তথ্য প্রকাশ না করেও প্রকল্পের মোট ব্যয়, অর্থ পরিশোধের অগ্রগতি, নিরীক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে জনসাধারণকে জানানো সম্ভব কি না, সেটি আলাদাভাবে বিবেচনা করা দরকার।

সংসদে জবাবদিহি
এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তোলা সম্ভব। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। সংসদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিধি অনুযায়ী, সাধারণভাবে প্রশ্নের নোটিশ কমপক্ষে ১৫ পূর্ণ কর্মদিবস আগে দিতে হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সম্মতিতে কম সময়েও প্রশ্ন গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

সংসদ সদস্যরা জানতে চাইতে পারেন, প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় কত, এখন পর্যন্ত কত অর্থ খরচ হয়েছে, কারখানা স্থাপনের অগ্রগতি কী, প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে কী ধরনের সক্ষমতা অর্জিত হবে এবং প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি নিরীক্ষা কে করবে। সংবেদনশীল তথ্য বাদ দিয়েও এসব বিষয়ে সরকারকে জবাব দিতে বলা যায়।

এ ছাড়া তথ্য অধিকার আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকাশযোগ্য প্রকল্প-সংক্রান্ত নথি চাওয়া যেতে পারে। কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে তার আইনি ভিত্তি কী, সেটিও জানতে চাওয়া সম্ভব। তবে চুক্তির সব ধারা পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

স্বচ্ছতা মানে সামরিক গোপনীয়তা ভেঙে দেওয়া নয়
৬০৮ কোটি টাকার ড্রোন প্রকল্প বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি দেশে ড্রোন উৎপাদন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রকৃত পরিধি, কারখানার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থার ওপর।

প্রকল্পটির বিষয়ে সরকার ইতিমধ্যে ব্যয়, উদ্দেশ্য ও চুক্তি স্বাক্ষরের তথ্য প্রকাশ করেছে। কিন্তু পূর্ণ চুক্তির শর্ত এবং বাস্তবায়নের জবাবদিহি সম্পর্কে আরও তথ্য ছাড়া প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন করা কঠিন।

আরও

শিশুদের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কোথায়?

এক্সক্লুসিভ

শিশুদের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কোথায়?

বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিশুর দূর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা বেশ বিস্তৃত। বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা বা খাল, রান্নাঘরের আগুন, গরম প...

২০২৬-০৯-২৩ ১৬:০৮

চিরকুট রহস্য: চাকরির সুপারিশ থেকে তদন্তের টেবিলে

এক্সক্লুসিভ

চিরকুট রহস্য: চাকরির সুপারিশ থেকে তদন্তের টেবিলে

রাজনীতির মঞ্চে কখনো বক্তৃতার ঝড় ওঠে, কখনো পোস্টারের হাসি শোভা পায়। আবার কখনো একটি চিরকুটই খুলে দেয় সম্পর্কের অন্দরমহলের...

২০২৬-০৯-২২ ১৭:২০

সরকারের ঋণ কমেনি, বদলেছে উৎস ও ঝুঁকির ধরন

এক্সক্লুসিভ

সরকারের ঋণ কমেনি, বদলেছে উৎস ও ঝুঁকির ধরন

সরকারের আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা এবং...

২০২৬-০৯-২১ ১৯:২৯

লাফিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু: ১৬ দিনেই ২১ হাজার ডেঙ্গু রোগী, মৃত্যু ৭৪

এক্সক্লুসিভ

লাফিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু: ১৬ দিনেই ২১ হাজার ডেঙ্গু রোগী, মৃত্যু ৭৪

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক গতিতে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজা...

২০২৬-০৯-১৬ ২২:০৪

অর্থের সঙ্গে বাড়ছে সংস্কারের চাপ, ঋণের কঠিন পরীক্ষা

এক্সক্লুসিভ

অর্থের সঙ্গে বাড়ছে সংস্কারের চাপ, ঋণের কঠিন পরীক্ষা

আন্তর্জাতিক দাতা ও ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মোড় নিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ব্যাংক খাত সংস্কারে অর্থ দিচ...

২০২৬-০৯-১৪ ১২:৩১