সম্প্রতি বিবিসি রেডিও ফোর-এর 'টুডে' অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্রিটেনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইউরোপের সঙ্গে গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের বর্তমান উদ্যোগকে ইতিবাচক আখ্যা দিলেও তিনি এর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। মিলিব্যান্ড উল্লেখ করেন, এখন পর্যন্ত যে পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে তা ২০৪০ সালের মধ্যে মাত্র ৯ বিলিয়ন পাউন্ডের সুবিধা দেবে। অথচ ব্রিটেনের সামগ্রিক অর্থনীতি ৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ডের; ফলে বৈশ্বিক বাস্তবতায় আরও বড় ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
ভবিষ্যতে ইইউ-তে ব্রিটেনের পুনরায় যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে মিলিব্যান্ড এটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভালো লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের আগে ব্রিটেন যে ধরনের বিশেষ সুবিধা ও চুক্তি ভোগ করত, হুবহু সেই অবস্থায় ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেই বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এই মুহূর্তে ব্রাসেলসের কাছে ব্রিটেনের চেয়ে ইউক্রেনের সদস্যপদ ইস্যুটি অনেক বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে সহযোগী সদস্যপদ ও বহুমাত্রিক সদস্যপদের মতো নতুন নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ নিয়ে জার্মানির একটি সাম্প্রতিক প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার আগে ইউক্রেনকে ভোটাধিকার ছাড়াই সহযোগী সদস্য হিসেবে ইইউ-এর বৈঠকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, যা কিয়েভ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইউরোপীয় নীতির পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়েও কথা বলেন ডেভিড মিলিব্যান্ড। তিনি মন্তব্য করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের আলোচনা না করে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সরকার পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে বড় ধরনের নীতিগত আলোচনা হওয়া উচিত। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে ব্রিটেনকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের লাখ লাখ তরুণ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শুধু নেতৃত্বের কোন্দলে মগ্ন থাকলে এই মৌলিক সমস্যাগুলো আড়ালে আবডালে থেকে যাবে।
মিলিব্যান্ডের এই বক্তব্যের সুর টেনে 'ইউরোপিয়ান মুভমেন্ট ইউকে'-এর চেয়ারম্যান মাইক গ্যালসওয়ার্থ বলেছেন, ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ ইউরোপ নীতি কেমন হবে তা নিয়ে সরকারের উচিত জনগণ এবং ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে আরও খোলামেলা ও স্বচ্ছ আলোচনা করা। সিঙ্গেল মার্কেটে পুনরায় যোগ দিলে ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ইতিবাচক গতি ফিরবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা দূর করতে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের এই নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের ওপরেও। লন্ডনে বসবাসকারী এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশী ব্যবসায়ী এই প্রসঙ্গে জানান, ব্রেক্সিটের পর থেকে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং খরচ অনেকাংশে বেড়ে গেছে। ব্রিটিশ সরকার যদি ইউরোপের সঙ্গে পুনরায় একটি টেকসই ও সহজলভ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটি ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।