যুক্তরাজ্যে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের উচ্চ করনীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রেকর্ড সংখ্যক তরুণ ব্রিটিশ দেশ ছাড়ছেন বলে নতুন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস (ওএনএস) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে দেশে ফেরার তুলনায় ১ লাখ ৩৬ হাজার বেশি ব্রিটিশ নাগরিক যুক্তরাজ্য ত্যাগ করেছেন। এটি সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ নেতিবাচক নিট অভিবাসনের রেকর্ড। বিশেষ করে ১৬ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই বিদেশমুখী প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত জীবনমান, ভালো কাজের পরিবেশ এবং উচ্চ আয়ের আশায় বিপুল সংখ্যক তরুণ ব্রিটিশ অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
ওএনএস-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক নিট অভিবাসন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজারে, যা করোনা মহামারীর পর গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো থেকে কম সংখ্যক কর্মী ও শিক্ষার্থী আসায় এই পতন ঘটেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মোট ২ লাখ ৪৬ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক দেশ ছেড়েছেন। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কিছুটা কম হলেও, এই সময়ে দেশে ফেরার হার আরও দ্রুত কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ১ লাখ ৪০ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক দেশে ফিরেছিলেন, সেখানে গত বছরে ফিরেছেন মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার জন।
এই পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনা চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যাবানা মাহমুদ দাবি করেছেন, গত ৩ বছরে নিট অভিবাসন ৮২ শতাংশ কমেছে এবং সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করেছে। নতুন দক্ষতানির্ভর অভিবাসন ব্যবস্থা চালু করে বিদেশি সস্তা শ্রমিকের ওপর ব্রিটেনের নির্ভরতা কমানো হবে বলেও তিনি জানান। তবে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি এই অভিবাসন চিত্রের কঠোর সমালোচনা করেছে। ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ বলেন, লেবার সরকারের উচ্চ কর, বাড়তি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্বল চাকরির বাজারের কারণেই তরুণেরা দেশ ছাড়ছেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে তরুণদের বেকারত্বের হার ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এদিকে, আশ্রয়প্রার্থী ইস্যুতেও বড় ধরণের পরিবর্তনের তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সেদেশের হোটেলগুলোতে অস্থায়ীভাবে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ৩৫ শতাংশ কমে ২০,৮৮৫ জনে নেমেছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় বাসা ও ফ্ল্যাটভিত্তিক আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮,৭১৯ জনে। একই সময়ে সামগ্রিক আশ্রয় আবেদন ১২ শতাংশ কমে ৯৩,৫২৫টিতে নেমে এসেছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি মানুষ অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন এবং প্রায় ৩৯ শতাংশ মানুষ কাজ, শিক্ষা বা ভিজিট ভিসায় এসে পরবর্তীতে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
গত ১ বছরে স্বরাষ্ট্র দপ্তর রেকর্ড ১ লাখ ৫১ হাজারের বেশি আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তি করেছে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার আবেদনই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলে আশ্রয় আবেদনের জট ২০১৯ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে আশ্রয় আবেদন কমলেও যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব পাওয়ার আবেদন নতুন রেকর্ড গড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত শেষ এক বছরে ৩ লাখেরও বেশি মানুষ ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন।