কাগজে লেখা হয়েছে অভিমান, অভিযোগ, বিশ্বাসভঙ্গ আর মানসিক কষ্টের কথা। ভাষাগুলো পড়লে মনে হয়, বাংলা সিনেমার কোনো চিত্রনাট্যের দৃশ্য হয়তো সামনে এসেছে। তবে বাস্তব জীবনের ঘটনায় পরিচালক ‘কাট’ বলার সুযোগ পান না। এখানে প্রতিটি লাইন, প্রতিটি আলামত এবং প্রতিটি বক্তব্য জায়গা করে নেয় তদন্তের খাতায়।
সাতক্ষীরার জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে চলমান ঘটনায় উদ্ধার হওয়া কয়েকটি হাতে লেখা চিরকুট এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জাতীয় সংসদের প্যাড, সাদা কাগজ, লাল-কালো কালির ব্যবহার এবং লেখার ধরন মিলিয়ে এগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ হিসেবে লেখা এই কাগজগুলোই এখন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের অংশ।
মানুষের জীবনে কখন কোন কাগজের গুরুত্ব বেড়ে যায়, সেটা বলা কঠিন। কোনো কাগজ চাকরি এনে দেয়, কোনো কাগজ বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে যায়, আবার কোনো কাগজ একদিন গিয়ে বসে পুলিশের তদন্ত ফাইলে। মরিয়ম খাতুনের জীবনের গল্পেও এখন আলোচনার কেন্দ্রে সেই কাগজগুলো।
গল্পের শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। একটি চাকরির আবেদন। একটি বায়োডাটা। আর একটি সুপারিশ। সেই সময় কেউ হয়তো ভাবেনি, একটি সুপারিশপত্র ভবিষ্যতে এত বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে। একটি চাকরির আশায় করা যোগাযোগ কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অধ্যায়ে ঢুকে গেল, সেটিই এখন নানা প্রশ্নের কেন্দ্রে। তারপর গল্পে যোগ হলো সম্পর্ক।
যোগাযোগ বাড়ল। পরিচয় ঘনিষ্ঠ হলো। সামনে এলো বিয়ের দাবি। গাজী নজরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, মরিয়ম তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তাদের বিয়ে পারিবারিকভাবে হয়েছে। মরিয়মও নিজেকে তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে প্রকাশিত তথ্য রয়েছে।
সবকিছু যেন চলছিল ব্যক্তিগত জীবনের ভেতরেই। কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত জীবন যে কখন জনসম্মুখের আলোচনায় চলে আসে, তার কোনো ক্যালেন্ডার নেই। বিশেষ করে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নামের আধুনিক ‘পাড়ার আড্ডাখানা’ কোনো ঘটনা হাতে পেয়ে যায়।
এরপর ছড়িয়ে পড়ে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও। শুরু হয় আলোচনা। কেউ বিশ্লেষক, কেউ বিচারক, কেউ আবার এমনভাবে মতামত দিতে থাকেন যেন পুরো ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা তিনিই। মানুষের এই এক অদ্ভুত প্রতিভা, তথ্যের আগে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া।
এরপর আসে সবচেয়ে ভারী অধ্যায়; মরিয়মের মৃত্যু। রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তার বাবা মামলা করেন। তদন্ত শুরু হয়। আর তখনই গল্পে প্রবেশ করে চিরকুট।
কয়েকটি হাতে লেখা কাগজ। কাগজগুলোতে ছিল সম্পর্কের টানাপোড়েন, অভিমান, অভিযোগ আর অবিশ্বাসের কথা। কোথাও যুদ্ধের ভাষা, কোথাও দাবার ঘুঁটির উপমা, কোথাও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যার চেষ্টা। চিরকুটগুলো হয়তো ভাবেনি, তার ভাগ্যে এমন হবে।
সকাল পর্যন্ত সে ছিল ব্যক্তিগত অনুভূতির কাগজ, বিকেলে হয়ে গেল তদন্তের আলামত। তদন্ত কর্মকর্তারা এখন খুঁজছেন, এই লেখাগুলো কার? কীভাবে লেখা হয়েছে? এর সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না?
অন্যদিকে মরিয়মের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এগুলো তার হাতের লেখা নয়। শাশুড়িও লেখার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে এসবের সত্যতা নির্ধারণ করবে পরীক্ষা ও তদন্ত। এখানেই চিরকুটের সবচেয়ে বড় বিপদ।
মানুষের লেখা চিঠি অনেক কিছু বলতে পারে, কিন্তু আদালতের ভাষায় শুধু বলা যথেষ্ট নয়। সেখানে প্রমাণ লাগে। এরপর আদালতের দৃশ্য। এক পাশে আসামি, অন্য পাশে রাষ্ট্রের প্রশ্ন। রিমান্ডের আবেদন, তদন্তের প্রয়োজন, আইনজীবীদের যুক্তি। আদালত যেন বলছে, ‘গল্প যতই নাটকীয় হোক, শেষ অধ্যায় লিখবে প্রমাণ।’
মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। আদালত গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রীকে এক দিনের রিমান্ড দিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে বাইরে চলছে আরেক গল্প। মানুষ জানতে চাইছে, কীভাবে একটি চাকরির সুপারিশ থেকে শুরু হওয়া সম্পর্ক এমন জায়গায় পৌঁছাল? কোন মুহূর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমীকরণ বদলে গেল? কোন কথাগুলো সত্য, কোনগুলো অভিযোগ, আর কোনগুলো শুধু আবেগের প্রকাশ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন খুঁজছে তদন্ত কর্মকর্তারা।
কারণ সম্পর্কের গল্পে আবেগ অনেক বড় চরিত্র। কিন্তু আদালতের গল্পে আবেগের জায়গা ছোট। সেখানে হাজির হয় কাগজ, আলামত, সাক্ষ্য আর পরীক্ষার ফল। একটি চিরকুট হয়তো একটি সম্পর্কের ভেতরের অন্ধকার দেখাতে পারে। কিন্তু সেই অন্ধকারে কে কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি বের করতে লাগে তদন্তের আলো।
শেষ পর্যন্ত এই গল্পের সবচেয়ে ব্যস্ত চরিত্র হয়তো সেই ছোট্ট কাগজ। একদিন সে ছিল ভালোবাসার কথা। আজ সে তদন্তের প্রশ্ন। আর মানুষের জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত সত্য হলো, কখনো কখনো একটি চিরকুটের ভাগ্যও মানুষের ভাগ্যের মতোই বদলে যায়। সকালে যে কাগজ ছিল ব্যক্তিগত, রাতে সেটিই হয়ে যায় ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায় থাকা একটি নথি।