কবে নাগাদ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শামীম ও সাব্বিরের মরদেহ শনাক্ত হবে, আর কবে সেই মরদেহ দেশে ফিরবে—তা এখনও নিশ্চিত নয়। সন্তান হারানোর বেদনার সঙ্গে এখন স্বজনদের অপেক্ষা, ‘লাশটা অন্তত একবার চোখে দেখবো’—এই আকুতি তাদের।
দুজনের পরিচয় শনাক্ত করতে সরকারিভাবে স্বজনদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নিহত শামীমের মা শাহিনুর বেগম। শামীম ও সাব্বিরের বাড়ি নলডাঙ্গা উপজেলায়।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে নলডাঙ্গার তিন জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের মরদেহ দেশে এসেছে। বাকি দুজনের মরদেহ শনাক্ত বা দেশে আনার বিষয়ে আমার কাছে হালনাগাদ তথ্য নেই।’
মরদেহ শনাক্তে বাবার ডিএনএ
নিহত শামীম হোসেন নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে। তার মা শাহিনুর বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার ব্যাডা খুব বড়ে (বেশি) পুইড়া গেছে। চেনা দেচ্ছে না। এ্যন (এখন) ডিএনএ টেস্ট করা লাগবি। তার বাপে (জাকির আলী) ডিএনএ দিয়া অইসে। অইগুলা ওই দ্যাশে (সৌদি আরব) প্যাটনো অইসে। কিন্তুক তারা এ্যনো দেহেনি। ৯ জনের লাশ প্যাটাইছে। এরপ্যরে তাগরে (ছেলেদের) সিরিয়াল ধরবি। আমার বোইনের ব্যাডা সাদ্দাম ওই দ্যাশেই কাজ ক্যারে। স্যা মোবাইল ফেনে মোক এইবাড়ে কলো।’
শামীমের বাবা জাকির হোসেন বলেন, ‘ছেলের লাশ ভয়াবহভাবে পুড়ে গেছে। এ কারণে পরিচয় শনাক্ত করতে সময় লাগছে বলে আমাকে জানানো হয়েছে। ঢাকায় গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনাও দিয়ে এসেছি। এখন শুধু অপেক্ষা করছি সন্তানের মরদেহ দেশে ফেরার।’
একই অপেক্ষায় সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ছেলের দেহ এমনভাবে পুড়ে গেছে যে আঙুলের ছাপেও পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ কারণে তিনিও ঢাকায় গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছেন। এখন আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন, যেন অন্তত ছেলের মরদেহটি ফিরে পান।
২১ দিনেও ফেরেনি লাশ
ধারদেনা করে ২০১৬ সালে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শামীম। ২০২১ সালে দেশে ফিরে বিয়ে করেন। পাঁচ বছর পর দ্বিতীয় দফায় সৌদি যাওয়ার সময় তার স্ত্রী ছিলেন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। প্রবাসে থাকা অবস্থায় শামীমের ঘরে জন্ম নেয় কন্যাসন্তান শাফাহ জান্নাহ।
মৃত্যুর আগের দিন সকাল ১০টার দিকে ভিডিও কলে শেষবার মেয়ের মুখ দেখেছিলেন শামীম। এরপরই সব শেষ। পরিবারের আক্ষেপ, ছোট্ট মেয়েটি হয়তো কোনো দিন বাবাকে নিজের চোখে দেখতে পারবে না।
কাঁদতে কাঁদতে শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুন বলেন, ‘অন্যদের লাশ এলেও আমার স্বামীর লাশ না আসায় হতাশ হয়ে পড়েছি। অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না। লাশটি এলে অন্তত কবরের পাশে গিয়ে দোয়া করতে পারবে আমার সন্তান।’
তিনি বলেন, প্রবাসে থেকেই মেয়ের নাম ছাপা জান্নাহ রেখেছিলেন শামীম। মেয়ের আকিকার জন্য টাকা পাঠিয়েছিলেন। প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন। স্বামীর মৃত্যুতে মেয়েকে কীভাবে লালন-পালন করবেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তায় স্থির থাকতে পারছেন না। একই সঙ্গে দুশ্চিন্তা হচ্ছে স্বামীর মরদেহ দেশে আসা নিয়েও।