যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অভিবাসন ইস্যু নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও দলের অভ্যন্তরে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম দেশটির বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত কঠোর অভিবাসন সংস্কার পরিকল্পনাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। বার্নহামের এই অবস্থান লেবার পার্টির ভেতরে থাকা প্রগতিশীল ও মানবিক অভিবাসন নীতির সমর্থকদের বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালায় স্থায়ী শরণার্থী মর্যাদা বাতিল, সুনির্দিষ্ট কিছু আশ্রয়প্রার্থীর সরকারি আর্থিক সহায়তা বন্ধ এবং যেসব দেশের পরিস্থিতি বর্তমানে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত, সেখানকার শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মতো কঠোর পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবটি হলো— বৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (ILR) এবং সেটলড স্ট্যাটাস পাওয়ার নূন্যতম সময়সীমা বর্তমানের ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা। এই কঠোর সংস্কার পরিকল্পনাগুলো নিয়ে খোদ লেবার পার্টির নীতিনির্ধারকদের মধ্যেই তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
দলের ভেতরের একটি বড় অংশ মনে করছে, নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী দল 'রিফর্ম ইউকে'-এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাই লেবার পার্টিকে এমন রক্ষণশীল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলোও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, লেবার পার্টির সাধারণ সদস্যদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানের চেয়ে আরও কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পক্ষে। তবে দলের প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই এই নীতিকে 'অ-ব্রিটিশ' বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং এর তীব্র সমালোচনা করে একে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
এদিকে অ্যান্ডি বার্নহামের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের অভিবাসন কমানোর পক্ষে। মেকারফিল্ড উপ-নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে রিফর্ম ইউকে-এর পক্ষ থেকে তাকে ‘ওপেন বর্ডারস অ্যান্ডি’ বলে রাজনৈতিক আক্রমণ করা হলেও, বার্নহাম স্পষ্ট করেছেন যে তিনি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল করতে চান না। তার মতে, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সীমান্তে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা জরুরি, তবে একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ও সমাজে অভিবাসীদের ইতিবাচক অবদানকেও মূল্যায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পর ভবিষ্যতে লেবার পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের দৌড়ে বার্নহাম অন্যতম শক্তিশালী প্রতিযোগী হতে পারেন।
যুক্তরাজ্যের এই সম্ভাব্য নীতি পরিবর্তনের খবরটি দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মতে, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে বৈধভাবে পড়াশোনা, চাকরি বা ব্যবসা করতে আসা করদাতা অভিবাসীদের একই পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না। বিশেষ করে আইএলআর (ILR) পাওয়ার সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে, তা নিয়ম মেনে ব্রিটেনে আসা হাজার হাজার দক্ষ পেশাজীবী ও তাদের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলবে।