ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য যদি পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগ দেয়, তবে দেশটিকে ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জন্য নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী আশ্রয় দিতে হবে। ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ইইউ-তে ফিরে গেলে ব্রিটেন আগের মতো আশ্রয় ও অভিবাসন নীতিতে কোনো বিশেষ ছাড় বা ‘অপ্ট-আউট’ সুবিধা পাবে না। ফলে ইইউ-এর নতুন অভিবাসন চুক্তির প্রতিটি নিয়মই যুক্তরাজ্যের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। এই তথ্য সামনে আসার পর ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন করে তুমুল বিতর্ক ও আলোচনার ঝড় উঠেছে।
সম্প্রতি লেবার পার্টির প্রভাবশালী নেতা ওয়েস স্ট্রিটিং ব্রেক্সিটকে একটি ‘বিপর্যয়কর ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পর এই আলোচনা আরও জোরদার হয়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার বিষয়ে জনগণের কাছ থেকে নতুন ম্যান্ডেট বা গণভোট নেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সরাসরি ইইউ-তে যোগ দেওয়ার কথা না বললেও ব্রাসেলসের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে একের পর এক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে চলছেন। তবে নতুন এই কোটা বিতর্কের ফলে তাঁর সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্রেক্সিটের পর ইইউ যে নতুন আশ্রয় ও অভিবাসন নীতি প্রণয়ন করেছে, তার মূল উদ্দেশ্য হলো ইতালি ও গ্রিসের মতো সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর থেকে অভিবাসীদের অতিরিক্ত চাপ কমানো। এই নীতি অনুযায়ী, আশ্রয়প্রার্থীদের সমস্ত সদস্য দেশের মধ্যে সুনির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ করে দেওয়া হবে। কোনো দেশ যদি শরণার্থী গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তবে প্রত্যেক প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তির বিপরীতে একটি বড় অঙ্কের অর্থ জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হবে। অবশ্য সদস্য দেশগুলো চাইলে সরাসরি শরণার্থী না নিয়ে সমপরিমাণ অর্থ দিয়েও এই দায়িত্ব এড়াতে পারবে। আগামী মাস থেকেই ইউরোপজুড়ে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি কার্যকর হতে যাচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের সাবেক ইইউ রাষ্ট্রদূত স্যার ইভান রজার্স (যিনি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন) এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, ব্রিটেন যদি ইইউ বা এর একক বাজারে ফিরতে চায়, তবে এই অভিবাসন চুক্তিতে অংশ নেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, ব্রিটেন ঠিক কতজন শরণার্থী নেবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ব্রাসেলসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে হলে অভিবাসন ইস্যুতে যুক্তরাজ্যকে বড় ধরনের ছাড় দিতেই হবে।
উল্লেখ্য, ব্রেক্সিটের পর থেকে ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা অবৈধ অভিবাসীদের ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে ফেরত পাঠানো যুক্তরাজ্যের জন্য চরম কঠিন হয়ে পড়েছে। এর আগে ইইউ-এর ‘ডাবলিন রেগুলেশন’-এর আওতায় প্রথম নিরাপদ ইউরোপীয় দেশে শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো যেত, যা ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন হারিয়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ-র সাথে ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ নীতি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছিলেন, কিন্তু সমগ্র ইইউ-এর সাথে এখনো কোনো স্থায়ী সমঝোতা হয়নি। ইইউ-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি বছর অন্তত ৩০ হাজার শরণার্থী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পুনর্বাসন করা হবে, যেখানে জার্মানি ও ফ্রান্স ইতিমধ্যে বড় কোটা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিলেও হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।