কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের তিস্তা নদী ঘেঁষা চর বজরা টারী পাড়া গ্রামে বসবাস করছেন আলেকজন বেওয়া (৫৬)। তিস্তা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি আত্মীয়-স্বজন হারিয়ে এখন ওয়াপদা বাঁধের খাস জমিতে মাথা গোঁজার ঠাই হয়েছে তার। দিনাজপুর শহরের বিদ্যুত অফিসের পাশের বস্তিতে বিয়ে হয়েছিল তার। সংসারে আলো করে আসে ৩ কন্যা সন্তান। তারা বড় হতেই ঢাকায় চলে যান তারা। সেখানেই মেয়েরা বড় হওয়ার পর গার্মেন্টেসে চাকুরী করা শুরু করে। সেখানেই বিয়ে হয় মেয়েদের। কিন্তু কপাল খারাপ আলেকজনের। তার দাম্পত্য জীবনে ছেলে সন্তান জন্ম দিতে না পারায় স্বামী আরেকটি বিয়ে করে তাকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেন। ঢাকায় মেয়েদের কাছে কিছুদিন থাকার পর মেয়েরাও মায়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে ঢাকার পাট চুকিয়ে গ্রামে চলে আসতে বাধ্য হন আলেকজন। এরপর আত্মীয়-স্বজনদের কাছে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু স্বজনরা বাড়তি ঝামেলা মনে করে তাকেও দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন। এরপর থেকেই আলেকজনের জীবনে নেমে আসে চরম অন্ধকার।
প্রতিবেশী মান্নান মিয়া বলেন, মহিলাটা খুব কষ্টে আছে। ঘর-দুয়ার নাই। শুধু চালা। ঝড়বৃষ্টি আসলে বাও বাতাস আসলে দৌড়াদৌড়ি করি এর-ওর বাড়িতে যায়। দিনের মধ্যে বাইরে থাকে। রাত হলে খুব কষ্ট হয়। গড়মে থাকা যায় না। খুব কষ্ট করি থাকে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙ্গাচোরা ছোট্ট টিনের চালায় মানবেতরভাবে বসবাস করছেন আলেকজন বেওয়া। দারিদ্রতা যেন আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। ছোট্ট টিনের চালার ভিতরটা অপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্রে ঠাসা। নড়াচড়া করার মতো জায়গা নেই। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিষ দিয়ে ঘর ভরিয়েছেন তিনি। একদিকে লাকড়ি রাখার মাচা। অপরদিকে তিন পায়া চৌকি। বাঁশ দিয়ে ঠেস দেয়া হয়েছে চৌকি ও টিনের চালা। চারদিক টিন দিয়ে ঘেরা থাকায় ঘরের ভিতর যেন আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে। পাঁচ মিনিট সেখানে টিকে থাকা দায়। একদিকে গড়মে ভোগান্তি অপরদিকে জোড়ে বাতাস উঠলে টিনের চালা এদিক ওদিক টলতে থাকে। ফলে ভয়ে আশ্রয় ছেড়ে অন্যের বাড়িতে চলে যান আলেকজন বেওয়া। এমন অসহায়ভাবেই দিন আর রাত কাটছে তার।
আলেকজন বেওয়া উদাস মাখা দৃষ্টিতে বলেন,‘ প্রথমে বাপে তারপর ছাওয়ারা মোক ঘর থাকি বাইর করি দিলে। এটে ভাই-ভাবীরাও নিলে না। মুই এলা কোটে যাং। একটা করি রাইত কাটপের চায়ে না। চোখ দিয়া ঝরঝর করি পানি পরি বিছানা ভাসি যায়। এলা কানবের চাইলেও কানবের পাং না। চোখ দিয়া পানি বেড়ায় না। সউগ পানি বের হয়া গেইছে। পেটে খায় তাই বাঁচি আছি। তোমরা এই দু:খ শুনি কি করবেন!’
প্রতিবেশী কহিনুর বেগম বলেন, মহিলার কপালটা খুবই খারাপ। ভাইয়েরা নেয় না, বেটিরাও নেয় না। স্বামীতো তালাক দিয়া বের করি দিছে। তার আইডি কার্ডও ছিঁড়ি ফেলাইছে। ফলে বয়স্কভাতা বা সরকারি ভাতা কোনটায় পায় না।
আলেকজনের দূর সম্পর্কের ভাতিজা সাইফুল জানায়, আমার ফুপুরা ৬/৭ বার নদী ভাঙ্গা দিছে। তার বাপ-মা মরি গেইছে। ভাইয়েরা আছে তারাও দিনমজুরী করি খায়। গ্রামের লোকজন চাঁদা তুলি একটা টিনের ছায়লা করি দিছে। ভিক্ষা করি যা পায় তাই দিয়া চলে। এখন আপনেরা যদি সহযোগিতা করেন তাহলে আমার ফুপুর খুব উপকার হবে।
বিষয়টি নিয়ে উলিপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার লুৎফর রহমান বলেন, আপনাদের মাধ্যমে আমরা যে বিষয়টি জানলাম ওই মহিলার কোন এনআইডি কার্ড নেই। সেহেতু ওই ওয়ার্ডের মেম্বারকে আমরা বলবো একটু সহযোগিতা করে নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে এনআইডি কার্ডের ব্যবস্থা করে। এনআইডি হলেই আমরা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যে বিধবা ভাতা আছে তার আওতায় নিয়ে আসতে পারবো।
এ ব্যাপারে মোবাইলে সাড়া না পেয়ে মুঠোফোনে বার্তা দিয়েও কথা বলেননি উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম আরিফ।