উচ্চ অভিবাসন হ্রাসের লক্ষ্যে ওয়ার্ক পারমিট বা স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ন্যূনতম বেতন সীমার শর্তে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে কাজের ভিসা পেতে হলে অনুমোদিত কোনো ব্রিটিশ কোম্পানি থেকে চাকরি পাওয়ার পাশাপাশি বার্ষিক বেতন ন্যূনতম প্রায় ৪১,৭০০ পাউন্ড হতে হবে। তবে কাজের ধরন ও খাতের ওপর ভিত্তি করে এই বেতন কাঠামো কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। এর পাশাপাশি আবেদনকারীকে অবশ্যই ইংরেজি ভাষায় নির্দিষ্ট মানের দক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে এবং স্পন্সর কোম্পানি যদি প্রাথমিক খরচ বহন না করে, তবে আবেদনকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অন্তত ১,২৭ো পাউন্ড থাকার প্রমাণ দেখাতে হবে। বর্তমানে দেশটির স্বাস্থ্য খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও শিক্ষা খাতে বিদেশী কর্মীদের জন্য তুলনামূলক বেশি সুযোগ থাকলেও, কম দক্ষতার চাকরিতে বিদেশী কর্মী নিয়োগের পথ প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে স্থানীয় ব্রিটিশ নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষার জন্য স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রেও নিয়মকানুন আগের চেয়ে অনেক বেশি যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করতে যাওয়ার প্রধান শর্ত হলো দেশটির সরকার অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিশ্চিত ভর্তির পত্র বা 'ক্যাস' (CAS) পাওয়া। এর সঙ্গে স্নাতক পর্যায়ের জন্য আইইএলটিএস (IELTS) স্কোর সাধারণত ৬ থেকে ৬.৫ এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের জন্য ৬.৫ থেকে ৭ থাকা বাধ্যতামূলক। টিউশন ফি হিসেবে বছরে ১০,০০০ থেকে ২৫,০০০ পাউন্ড খরচের পাশাপাশি লন্ডনে থাকার জন্য বছরে প্রায় ১৩,৩৪০ পাউন্ড এবং লন্ডনের বাইরে পড়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যাংকে দেখাতে হয়। এছাড়া প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবা ফি বা ইমিগ্রেশন হেলথ সারচার্জ (IHS) প্রদান করতে হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা এবং ছুটির সময়ে পূর্ণাঙ্গ সময় কাজ করার সুযোগ পান। কোর্স শেষে গ্রাজুয়েট ভিসার আওতায় সাধারণত দুই বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থান ও চাকরি খোঁজার সুযোগ থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল (ডিপেন্ডেন্ট) পরিবার নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
পারিবারিক পুনরেকত্রীকরণ বা স্পাউস ভিসার ক্ষেত্রেও আর্থিক শর্তাবলী উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে যুক্তরাজ্যের নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা পার্টনারের ন্যূনতম বার্ষিক আয় এখন প্রায় ২৯,০০০ পাউন্ড হতে হবে, অথবা এর বিকল্প হিসেবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮৮,০০০ পাউন্ডের সমপরিমাণ বড় অঙ্কের সঞ্চয় দেখাতে হবে। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের প্রমাণ ও ইংরেজি ভাষার দক্ষতা জরুরি। এই ভিসায় প্রাথমিকভাবে আড়াই বছরের অনুমতি দেওয়া হয়, যা পরে আরও আড়াই বছরের জন্য নবায়নযোগ্য। এভাবে মোট পাঁচ বছর যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাসের পর স্থায়ীভাবে থাকার (ILR) আবেদন করা যায় এবং তার এক বছর পর নাগরিকত্বের যোগ্য হওয়া যায়, যার জন্য 'লাইফ ইন দ্য ইউকে' টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক।
বর্তমানে যারা ভিজিটর ভিসায় যুক্তরাজ্য ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস) অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, অতীতে অন্যান্য দেশ ভ্রমণের ইতিহাস এবং সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। একই সাথে যারা ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন, তাদের ভিসা নবায়ন, চাকরি পরিবর্তন বা স্থায়ী বসবাসের আবেদনের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি কড়াকড়ির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য স্টুডেন্ট ভিসা এখনও তুলনামূলক কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হলেও, উচ্চ বেতন সীমা ও কঠোর যোগ্যতার কারণে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা পাওয়া এখন অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।