এদিকে পানির চাপ নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের সবগুলো জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। যদিও মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বর্ষা ও বন্যার তীব্রতা অনুযায়ী জলকপাটগুলো সবচেয়ে বেশি সময় খোলা রাখা হয়।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে নীলফামারীর ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে পানির বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার হলেও সন্ধ্যায় পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ৫১ দশমিক ৮১ মিটার।
এর আগে সকাল ৯টায় একই পয়েন্টে পানির প্রবাহ বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার নিচে পরিমাপ করা হয়। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের মিডিয়া সেল থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
পানি বাড়তে থাকায় নীলফামারীর ডিমলা ও লালমনিরহাটের নদীসংলগ্ন চরাঞ্চলের বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিম্নাঞ্চলে থাকা মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে বলেছে পাউবো।
একই নদীতে উজানের পানির টান পড়েছে রংপুরের নিম্নাঞ্চলগুলোতেও। গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর সেতু পয়েন্টেও পানির প্রবাহ বেড়েছে। জেলার কাউনিয়ায় তিস্তা সেতু পয়েন্টে সন্ধ্যা ৬টার দিকে পানি বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর আগে সকাল ৯টায় বিপৎসীমার ৫৭ সেন্টিমিটার নিচে ছিল পানির প্রবাহ। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ২৯ দশমিক ৩১ মিটার ধরা হয়।
নদীতে পানি বাড়তে থাকায় গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রশাসন দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
গঙ্গাচড়ার স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আসাদুজ্জামান বলেন, উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জয়রাম ওঝা মৌজায় একসময় ৫০০ মানুষের বসতি ছিল। সেখানে এখন নদীর দিকে তাকালেই মানুষের চোখে ভেসে ওঠে অনিশ্চয়তা। তিস্তার করাল গ্রাসে একের পর এক বাড়ি বিলীন হওয়ার পথে। আজ যে উঠানে সংসার, কাল সেখানে হয়তো নদীর স্রোত। নতুন করে নদীতে পানি বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার ঘরবাড়ি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু নিরাপদ জায়গাটুকুও কতদিন নিরাপদ থাকবে, সেই নিশ্চয়তা কারও নেই।
প্রতিদিন ক্যামেরার লেন্সে নতুন নতুন ছবির গল্প তুলে আনতে ছুটে বেড়ানো এই সংবাদকর্মীর ভাষায়, নদীপাড়ের এই মানুষগুলোর জীবনে ঘর মানে শুধু টিনের চাল আর কাঠের খাট নয়, ঘর মানে স্মৃতি, শৈশব, সন্তানের বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। নদী যখন সেই ঘরটুকুও কেড়ে নিতে আসে, তখন মানুষ আসলে শুধু একটি বাড়ি হারায় না হারায় জীবনের একটি অধ্যায়। তবে তিস্তা তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন দেখার সাহসটুকো কেড়ে নিতে পারেনি।
এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পরিস্থিতি এবং পূর্বাভাস সূত্রে জানা গেছে, উত্তর আন্দামান সাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আরও ঘনীভূত হতে পারে। এর প্রভাবে আগামী তিন দিন দেশের অভ্যন্তরে ও তৎসংলগ্ন উজানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর অঞ্চলে ধরলা নদীর পানি বেড়েছে। তিস্তা ও দুধকুমারের পানি সমতলে স্থিতিশীল রয়েছে। তিস্তার পানি আগামী এক দিন বাড়তে পারে এবং পরবর্তী দুদিন কমতে পারে। ধরলা ও দুধকুমারের পানি আগামী তিন দিন বাড়তে পারে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক জানান, উজানে প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঢলের কারণেই তিস্তায় এই পানি বৃদ্ধি। উজান থেকে পানি আসা অব্যাহত থাকলে তিস্তার পানি যেকোনো মুহূর্তে বিপৎসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করতে পারে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান জানান, রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ১২ ঘণ্টায় রংপুরে ১১ দশমিক শুন্য মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।