শরিক ও সমমনা দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ—আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণে সরকার ধীরগতি ও কার্যকর সদিচ্ছার অভাব দেখাচ্ছে।
নির্বাচনের আগে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের কথা বলা হলেও মন্ত্রিসভায় শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব হাতেগোনা কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। ফলে অভ্যুত্থান-পরবর্তী জাতীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোট বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে শরিকদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি যেন ‘কথার কথা’
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সরকারের কর্মকাণ্ডে চরম হতাশা প্রকাশ করে জানান, প্রথম আট মাসে সুশাসন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও জননিরাপত্তায় সরকার প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি। তিনি বলেন, “বিএনপির নিজস্ব ৩১ দফা সংস্কার রূপরেখা, জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রতিশ্রুতি থেকেও সরকার দূরে সরে যাচ্ছে। সরকার কথা দিয়ে কথা রাখছে না, তারা এখন অন্য কিছু ভাবছে।”
সংবিধান সংস্কারসহ কাঠামোগত পরিবর্তনের যে রায় ভোটাররা দিয়েছিল, সরকার সেখানে উল্টো পথে হাঁটছে, পেছনে সরছে বলেও অভিযোগ করেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, সবার মতামত নিয়ে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিএনপি সরকার একক সিদ্ধান্তে আইন পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। তিনি মন্তব্য করেন, “যেসব বিষয়ে সংস্কারের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন ছিল না এবং সবার সম্মতি ছিল, সরকার সেসব ক্ষেত্রেও পিছিয়ে যাচ্ছে। সরকার অত্যন্ত বিপজ্জনক পথে এগোচ্ছে, যা আবারও স্বৈরাচারী শাসন ফিরে আসার পথ খুলে দিতে পারে।”
তবে তিনি যোগ করেন, সরকারের সামনে এখনো নিজের ভুল শুধরে সঠিক পথে ফেরার সুযোগ রয়েছে। শিগগিরই নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে না পারলে এর জন্য চরম রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সরকারের সদিচ্ছার চেয়ে তাদের দেশ পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “প্রথম আট মাসে কিছু অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ থাকলেও জননিরাপত্তা ও আইনের শাসনে সরকার সফল হতে পারেনি। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দুর্নীতির অভিযোগ আগের মতোই আসছে।”
দল ও সরকারকে আলাদা রাখার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে দলের নিজস্ব রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য নীতি এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সরকারকে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি
সুশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পরও মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। সম্প্রতি স্থানীয় সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থীদের হাতে সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছাড়াও মফস্বলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের ওপর নিয়মিত হামলা ও মামলার ঘটনা ঘটছে।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের গত কয়েক মাসেই পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দেড় শতাধিক সাংবাদিক শারীরিক হামলা, হুমকি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুরোনো প্রভাবশালী মহলের পাশাপাশি নতুন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর রোষানল তৈরি হচ্ছে। ডিজিটাল ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় পেশাগত দায়িত্ব পালনে গভীর সেলফ-সেন্সরশিপ তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় হলো:
—গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর প্রতিটি হামলা ও হত্যার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা।
—সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলা দ্রুত প্রত্যাহার করা।
—তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং সাংবাদিকদের শারীরিক সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন করা।
অভ্যুত্থানের আকাক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে অপরাধ দমন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার কোনো বিকল্প নেই। সাবেক শরিকদের মতে, সরকার যদি অবিলম্বে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে জনগণের ক্ষোভ আবারও রাজপথের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।