দুদকের অনুসন্ধান বলছে, কথিত জাল দলিল তৈরি করে সরকারি জমির মালিকানা দাবি, সেই দলিল ব্যবহার করে নামজারি, সরকারি কর্মকর্তার দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং বছরের পর বছর সরকারি সম্পত্তি দখলে রেখে ভাড়া না দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় বুধবার (৭ অক্টোবর) দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক সবুজ হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
এতে আসামি করা হয়েছে ফাতেমা বেগম (৯০), তার চার ছেলে-মেয়ে মো. ফরিদ আহমদ (৫৩), মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদ (৩৯), মোহাম্মদ ফয়েজ আহমদ (৬১), হাসিনা মমতাজ (৬০), রোকেয়া সুলতানা (৫৭), শাহীন সুলতানা (৫০) এবং গণপূর্ত চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও বর্তমানে বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুককে (৪৬)।
মামলার বিষয়টি ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন দুদক চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, ডবলমুরিং থানার গোসাইলডাঙ্গা মৌজায় আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার লে-আউট প্ল্যানের ১৬ নম্বর প্লটের ২৪ দশমিক ৯৬ শতক জমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন সরকারি সম্পত্তি। ২০২৫ সালের সরকারি মৌজা রেট অনুযায়ী ওই জমির মূল্য ১৭ কোটি ১২ লাখ ৬৩ হাজার ১৪০ টাকা। এর ওপর থাকা ভবনের ভাড়া বাবদ আরও ৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮ টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। দুদকের হিসাবে জমির মূল্য ও বকেয়া ভাড়া মিলিয়ে আত্মসাতের পরিমাণ ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৮ টাকা।
অনুসন্ধান নথি অনুযায়ী, জমিটি ১৯৫৮ সালে মেসার্স এস জে অ্যান্ড জি ফজলে এলাহী লিমিটেডের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং ১৯৫৯ সালে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের পর প্রতিষ্ঠানটি পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করলে ১৯৭২ সালে সম্পত্তিটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় থাকা পরিত্যক্ত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি হিসেবে এটি পরিচালিত হয়।
কিন্তু ২০০২ সালে কনকর্ড ট্রেডিং কোম্পানির পক্ষে ফরিদ আহমদ ও তার বোন হাসিনা মমতাজ ভবন ও জমিটি সরকারের কাছ থেকে লিজ নেওয়ার আবেদন করেন। সরকারি হিসাবে মাসিক ৩৯ হাজার ৫৩৫ টাকা ভাড়া নির্ধারণের পর ২০০৩ সালের ৭ জুন তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়। ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ২১ লাখ ৮ হাজার ৩১৬ টাকা ভাড়া দেওয়া হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লিজ নবায়ন করা হয়নি। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় লিজ বাতিল করে সম্পত্তি দখলে নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
দুদকের অভিযোগ, সরকারি সম্পত্তির ওপর দখল বজায় রাখার পাশাপাশি ফাতেমা বেগম পরে ওই জমির মালিকানা দাবি করে একটি কথিত পুরোনো দলিল হাজির করেন। ১৯৭০ সালের ১৯ মে পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৩২৮০ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জমিটি কেনার দাবি করেন তিনি। কিন্তু অনুসন্ধানে ওই দলিলের মূল কপি বা সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়া যায়নি। পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসও জানায়, ১৯৭০ সালের রেকর্ডপত্র মুক্তিযুদ্ধের সময় পুড়ে যাওয়ায় ওই দলিলের রেকর্ড তাদের কাছে নেই।
দুদকের অনুসন্ধানে কথিত দলিলটি নিয়ে আরও গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, ফাতেমা বেগম ও মূল লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জমি বিক্রির চুক্তি হয় ১৯৭০ সালের ৩ জুলাই। অথচ তিনি যে দলিলের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি করেছেন, সেটি ১৯ মে ১৯৭০ তারিখের—অর্থাৎ বিক্রয় চুক্তির প্রায় দুই মাস আগের। এ ছাড়া ওই সময়ের দলিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্রে বলপয়েন্ট কলমে স্বাক্ষরের বিষয়টিও দুদকের অনুসন্ধানে সন্দেহজনক হিসেবে উঠে এসেছে।
এই কথিত দলিলকে ভিত্তি করেই ২০১২ সালে সরকারি জমিটি নিজের নামে নামজারির উদ্যোগ নেন ফাতেমা বেগম। এ সময় গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেন। দুদকের অভিযোগ, ফাতেমা বেগমের দেওয়া কথিত দলিলসহ অন্যান্য রেকর্ডপত্র তিনি সত্যায়িত করেন। পরে ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জমিটি নামজারির অনুমতি দেওয়া হয়।
এরপর আগ্রাবাদ ভূমি অফিসে নামজারির আবেদনের পর ২৪ দশমিক ৯৬ শতক জমিটি ফাতেমা বেগমের নামে নামজারি হয়। ২০২০ সালে তিনি হেবা দলিলের মাধ্যমে জমিটি তার চার সন্তান ফয়েজ আহমদ, হাসিনা মমতাজ, রোকেয়া সুলতানা ও শাহীন সুলতানার নামে হস্তান্তর করেন।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই সরকারি সম্পত্তিতে তিনতলা ভবন রয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশে ফরিদ আহমদের কনকর্ড ট্রেডিং, হাসিনা মমতাজের চিকিৎসাকেন্দ্র এবং ফাহিম আহমেদের আগ্রাবাদ কনভেনশন হল পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের একটি অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছেও ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, সরকারি সম্পত্তি লিজ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনার পর লিজ নবায়ন না করে দখল বজায় রাখা, পরে কথিত জাল দলিলের মাধ্যমে মালিকানা দাবি করা, সরকারি কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে সেই দাবিকে প্রতিষ্ঠা করা এবং শেষ পর্যন্ত জমিটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হেবা করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভবনের ভাড়ার হিসাবেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পেয়েছে দুদক। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের পরিমাপ অনুযায়ী ২০০৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকারি হারে ভবনটির ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৬ কোটি ৭৬ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৪ টাকা। এর মধ্যে ২১ লাখ ৮ হাজার ৩১৬ টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি ৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮ টাকা পরিশোধ করা হয়নি।
দুদকের উপ-পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার, জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। এ অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে।