ফিলিস্তিনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ফিফার এই বিতর্কিত আচরণ নতুন কিছু নয়। সংস্থাটির গঠনতন্ত্রে মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার থাকলেও, ফিলিস্তিনি ফুটবলের ক্ষেত্রে তারা বছরের পর বছর ধরে তা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএফএ) বহুবার দাবি জানিয়েছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে বসবাসকারী ক্লাবগুলোর লিগ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (আইএফএ) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হোক। কিন্তু ফিফা সেই দাবি বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের হত্যা, আহত হওয়া কিংবা গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোরও নিন্দা জানায়নি ফিফা। সর্বশেষ গ্রেপ্তার হওয়া ফিলিস্তিন নারী দলের খেলোয়াড় র্যান্ড হালাওয়ানি ও নাতালি আবু দায়েহর মুক্তির দাবিও তারা তোলেনি। ফিলিস্তিনি স্টেডিয়াম ধ্বংস কিংবা দলগুলোর যাতায়াতে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাতেও ফিফা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
সমালোচকদের মতে, আইএফএ শুধু বর্ণবাদ, বর্ণবৈষম্য (অ্যাপারথেইড) ও দখলদারিত্বকে স্বাভাবিক করে তোলেনি; বরং গাজা ও লেবাননে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফুটবলারদের প্রশংসাও করেছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) একাধিক রায় এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও ফিফা এখনও দাবি করে, ফিলিস্তিনের অভিযোগগুলো "আন্তর্জাতিক জনআইনের অধীনে অত্যন্ত জটিল বিষয়" এবং পশ্চিম তীরের চূড়ান্ত আইনি অবস্থান এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। সমালোচকদের ভাষ্য, এটি মূলত ইসরায়েলের অবস্থানকেই সমর্থন করে এবং ফিলিস্তিনি ভূমি দখলকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টার সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলে।
যেভাবে ইসরায়েল পর্যটন, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম ও কৃষিকে দখলদারিত্ব স্বাভাবিক করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, একইভাবে ফুটবলকেও ব্যবহার করেছে এবং তাতে ফিফার সহযোগিতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অভিযোগ
সমালোচকদের মতে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর আমলে সংস্থাটির এই ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) অভিযোগ জানিয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্ণবৈষম্য এবং যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি কার্যকর ব্যবস্থা নেননি এবং এ বিষয়ে পাঠানো অসংখ্য প্রতিবেদন ও চিঠি উপেক্ষা করেছেন।
শুধু নীরব থাকাই নয়, ইসরায়েলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টায়ও ফিফা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত মাসে একটি অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচ হিসেবে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে মুখোমুখি করার প্রস্তাব দেয় ফিফা, যার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয় "শান্তি প্রতিষ্ঠা"। এর কয়েক সপ্তাহ আগে ইনফান্তিনো ব্যক্তিগতভাবে পিএফএর সভাপতিকে তার ইসরায়েলি সমকক্ষের সঙ্গে করমর্দন করতে চাপ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ফিফার রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
সমালোচকদের মতে, ফিফা আর নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে কাজ করছে না। সংস্থাটি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
এই অভিযোগের পক্ষে ইনফান্তিনোর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৮ সালে তিনি ওয়াশিংটনে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ২০২১ সালে তিনি ডানপন্থী ইসরায়েলি পত্রিকা জেরুজালেম পোস্ট-এর এক সম্মেলনে অংশ নেন, যা জেরুজালেমের মামিল্লাহ মুসলিম কবরস্থানের জায়গায় নির্মিত একটি স্থাপনায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিতর্কিত "বোর্ড অব পিস"-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এই সংগঠনের লক্ষ্য জাতিসংঘকে ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক আইনি প্রচেষ্টা থামানো বলে সমালোচকরা দাবি করেন। সেখানে ইনফান্তিনো বোর্ডটির সঙ্গে ফুটবলের মাধ্যমে পুনর্গঠন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি "কৌশলগত অংশীদারত্ব"-এর ঘোষণাও দেন।
ফিফার বিশ্বকাপ বিতর্ক ও আস্থার সংকট
বিশ্বকাপ আয়োজন ঘিরে চলমান বিতর্কগুলোও এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই দেখা উচিত বলে মত দিয়েছেন লেখক। তার মতে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে ফিফা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে এবং ফুটবলকে রাজনীতিমুক্ত রাখার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র আয়োজক দেশ হিসেবে খেলোয়াড়, রেফারি ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে ইনফান্তিনো জনসাধারণকে "শান্ত থাকুন, আরাম করুন" বলে মন্তব্য করেছিলেন।
লেখকের মতে, এসব ঘটনা ফিফার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ইনফান্তিনো যদি তার অবস্থান পরিবর্তন না করেন, তবে তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার হবে ধ্বংসের প্রতীক।
সবশেষে লেখক বলেন, সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ফিলিস্তিনি ফুটবল টিকে থাকবে। ১৯০৪ সালে জেরুজালেমের সেন্ট জর্জ স্কুল দলের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে ফুটবল ফিলিস্তিনিদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর ফিলিস্তিনের অন্যান্য কিছুর মতোই এই খেলাও দখলদারিত্ব, গণহত্যা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ফিফার মধ্যেও টিকে থাকার শক্তি রাখে।