দম্পতির দুই সন্তান- ৭ বছর বয়সী আর্চি ও ৫ বছর বয়সী লিলিবেটকে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাজ্যের স্কুলে ভর্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে। রাজপরিবারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারীদের ধারণা, পরিবারটি লন্ডনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত বাসভবনে থাকবে।
তাঁদের এই সিদ্ধান্তের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—কী বদলে গেল?
সন্তানদের জন্যই কি ফিরছেন হ্যারি-মেগান?
রাজপরিবারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারীদের মতে, সন্তানদের যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করানোর আকাঙ্ক্ষা হ্যারির ফিরে আসার অন্যতম কারণ হতে পারে।
২০২৩ সালে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আদালতের শুনানিতে হ্যারির আইনজীবী তাঁর একটি বিবৃতি পড়ে শোনান। সেখানে হ্যারি বলেছিলেন, যুক্তরাজ্য তাঁর সন্তানদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশেই সন্তানরা যেন স্বাচ্ছন্দ্য ও আপন অনুভব করে, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা।
রয়্যাল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির ফেলো ও ‘আফটার এলিজাবেথ: ক্যান দ্য মনার্কি সেভ ইটসেলফ?’ বইয়ের লেখক এড ওয়েন্সের মতে, হ্যারি-মেগান চান তাঁদের সন্তানরা মার্কিন পরিচয়ের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও বেড়ে উঠুক।
চার্লসের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ
হ্যারির ফিরে আসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে তাঁর বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক করা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার্লসের ক্যানসার শনাক্ত হয়। পরে বাকিংহাম প্যালেস জানিয়েছে, চিকিৎসায় তিনি ভালো সাড়া দিচ্ছেন।
গত বছর বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হ্যারি বলেছিলেন, তাঁর বাবা আর কত দিন বেঁচে থাকবেন, তা তিনি জানেন না।
২০২৫ সালে হ্যারি তাঁর বাবার সঙ্গে লন্ডনের রাজপ্রাসাদে চা পান করেন। এটিকে বাবা-ছেলের সম্পর্কের তিক্ততা কাটানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। গত মাসে হ্যারি-মেগান সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে গেলে তাঁরা রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলার সঙ্গে হাইগ্রোভ হাউসে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন।
তবে ওই সাক্ষাতের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, তখন যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
উইলিয়ামের সঙ্গে দূরত্ব এখনো কাটেনি
হ্যারির সঙ্গে তাঁর ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের সম্পর্কের উন্নতির কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ অবশ্য এখনো দেখা যাচ্ছে না।
হ্যারির স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’, নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রাজপরিবারের ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ্যে আসায় উইলিয়াম ক্ষুব্ধ বলে জানা যায়। হ্যারি নিজেও এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর পরিবারের কিছু সদস্য তাঁকে কখনোই ক্ষমা করবেন না।
‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল: রয়্যাল উইমেন অ্যান্ড দেয়ার ব্যাটলস’ বইয়ের লেখক ক্যাথরিন মেয়ার মনে করেন, হ্যারির সঙ্গে দেখা করতে উইলিয়ামের অনীহা এখনো কাটেনি। ফলে দুই ভাইয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন
যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার ক্ষেত্রে হ্যারির জন্য নিরাপত্তা বরাবরই বড় একটি বিষয়। রাজপরিবারের সক্রিয় দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁর সরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থা কমিয়ে দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আইনি চ্যালেঞ্জেও চলতি বছরের শুরুতে হ্যারি হেরে যান।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, হ্যারি ও মেগানের জন্য কী মাত্রার নিরাপত্তা প্রয়োজন, সেটি তাঁদের পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয়।
সংবাদমাধ্যমের নজর এড়ানো কঠিন
যুক্তরাজ্যের ট্যাবলয়েড সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে হ্যারির দীর্ঘদিনের বিরোধও তাঁদের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, ফোনে আড়ি পাতা ও ব্যক্তিগত গোয়েন্দা ব্যবহারের অভিযোগে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে হ্যারি আইনি লড়াই করেছেন। কিছু মামলায় তিনি জয়ী হলেও সাম্প্রতিক একটি মামলায় তাঁর অভিযোগ আদালত খারিজ করে দেন।
রাজপরিবারের পর্যবেক্ষকদের ধারণা, হ্যারি-মেগান তাঁদের সন্তানদের যতটা সম্ভব জনসম্মুখের নজর থেকে দূরে রাখতে চাইবেন। সে কারণেই লন্ডনের বাইরে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাঁরা।
তবে তাঁদের পেশাগত ও জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডের কারণে পুরোপুরি আড়ালে থাকা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ফিরলেও বিতর্ক পিছু ছাড়বে?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে হ্যারি ও মেগানকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাবের কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে প্রিন্স উইলিয়াম ও তাঁর স্ত্রী কেটের তুলনায় তাঁদের জনপ্রিয়তা কম।
তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হ্যারি-মেগান এখনো বেশ জনপ্রিয় বলে মনে করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁদের প্রত্যাবর্তন রাজপরিবারের সঙ্গে নতুন করে জনসম্পর্ক তৈরির সুযোগও তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ, একদিকে বাবা চার্লসের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ, অন্যদিকে সন্তানদের ব্রিটিশ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করানোর আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়েই হয়তো ছয় বছর পর যুক্তরাজ্যে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন হ্যারি-মেগান। তবে রাজপরিবার, সংবাদমাধ্যম ও ব্রিটিশ জনগণের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কতটা বদলায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।