সম্প্রতি ফিলিস্তিন অ্যাকশনকে সমর্থন ও গাজায় চলমান যুদ্ধের প্রতিবাদে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছেন ৬০ জনের বেশি মানুষ। আন্দোলনের সমন্বয়কারী সংগঠন ডিফেন্ড আওয়ার জুরিসের তথ্য অনুযায়ী, এসব বক্তব্য সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। টেররিজম অ্যাক্ট ২০০০-এর সেকশন ১২-এর আওতায় সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের মিডল্যান্ডসের কয়েকটি বাড়িতে কাউন্টার টেররিজম কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়েছেন। এসব অভিযানে দরজা ভেঙে প্রবেশ ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করার ঘটনাও ঘটেছে। অন্য বিক্ষোভকারীদের অনেকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অপেক্ষা করছেন।
সমালোচকদের মতে, এসব ঘটনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—গ্রেপ্তার বা অভিযানের মুখোমুখি হওয়া বিক্ষোভকারীদের বড় অংশই শ্বেতাঙ্গ। এর ফলে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মুসলিমদের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ
লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, গত ২৫ বছর ধরে টেররিজম অ্যাক্ট ২০০০ যুক্তরাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবনে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলেছে। বিমানবন্দরে সন্দেহ ছাড়াই জিজ্ঞাসাবাদ, শিক্ষার্থীদের আচরণের কারণে ‘প্রিভেন্ট’ কর্মসূচিতে রেফার করা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোর উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন চেইজ ইন্টারন্যাশনালের দীর্ঘদিনের গবেষণার উল্লেখ করে লেখাটিতে বলা হয়েছে, টেররিজম অ্যাক্টের শিডিউল ৭-এর আওতায় তল্লাশির ক্ষেত্রে মুসলিম পটভূমির মানুষের বিরুদ্ধে ব্যাপক বৈষম্য হয়েছে।
লেখাটির যুক্তি, একই আইন যখন মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সন্দেহকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। বিপরীতে একই আইনে শ্বেতাঙ্গ বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হলে অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অযৌক্তিক ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘বিশেষাধিকার’ ব্যবহারের আহ্বান
লেখাটিতে এই পার্থক্যকে ‘শ্বেতাঙ্গ বিশেষাধিকার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর অর্থ সম্পদ বা সামাজিক সুবিধা নয়; বরং পুলিশের সংস্পর্শে আসার পরও নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার তুলনামূলক সুবিধা—এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনে শ্বেতাঙ্গ বিক্ষোভকারীদের এই সামাজিক সুবিধা রাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বৈষম্যমূলক প্রয়োগকে সামনে আনতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে লেখাটিতে ‘চেনা সন্দেহভাজন’ শব্দবন্ধ ব্যবহারেরও সমালোচনা করা হয়েছে। কারণ, কোনো বিক্ষোভকারীকে ‘চেনা সন্দেহভাজন নন’ বলে আলাদা করলে তার বিপরীতে এমন একটি শ্রেণি তৈরি হয়, যাদের বিরুদ্ধে একই আইন প্রয়োগকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে।
লেখাটির মতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগে কে ‘গ্রহণযোগ্য’ এবং কে ‘সন্দেহভাজন’—এমন শ্রেণিবিন্যাস মেনে নেওয়া উচিত নয়। একই আইনের আওতায় মুসলিম ও শ্বেতাঙ্গ উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ফিলিস্তিন অ্যাকশন নিষিদ্ধের আইনি লড়াই
ফিলিস্তিন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা নিয়েও যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলছে। লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল। পরে জুনে কোর্ট অব আপিল সেই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিলের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
এর মধ্যেই সংগঠনটির প্রতি সমর্থন জানানো এবং নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।
‘সম্মান শুধু গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্যে নেই’
লেখাটির শেষাংশে বলা হয়েছে, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্যেই প্রতিবাদের দায় শেষ হয় না। বরং একই আইনের আওতায় দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়নের অভিযোগ তুলে আসা মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আইনের বৈষম্যমূলক প্রয়োগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখাটিতে ফিলিস্তিনে যুদ্ধ ও দখলদারত্বের অবসান, গাজায় সহিংসতা বন্ধ এবং বর্ণবাদী বৈষম্যের অবসানের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ ও বক্তব্য লেখাটির লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ও দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে; যুক্তরাজ্য সরকার বা সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বক্তব্য এখানে আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়নি।