৭ম পর্বে যা ছিল- প্রকৃত শরণার্থীদের কান্না: মিথ্যার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সত্য
যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের কিছু অভিবাসী নিজেদের সমকামী পরিচয় দিয়ে আবেদন করছেন—এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, তাদের একটি অংশকে মিথ্যা গল্প শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কীভাবে সাক্ষাৎকারে কথা বলতে হবে, কীভাবে নিজেদের যৌন পরিচয় তুলে ধরতে হবে, এমনকি কোন ধরনের প্রমাণ জমা দিতে হবে—সবই সাজিয়ে দিচ্ছে কিছু অসাধু পরামর্শকচক্র।
‘দেশে ফিরলে প্রাণহানির আশঙ্কা’
অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, আবেদনকারীদের শেখানো হচ্ছে, নিজ দেশে ফিরে গেলে যৌন পরিচয়ের কারণে নির্যাতন, হামলা কিংবা প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে—এমন দাবি তুলতে।
এই দাবিকে শক্তিশালী করতে তাদের বলা হচ্ছে গে ক্লাব, সামাজিক অনুষ্ঠান বা সমকামী অধিকারবিষয়ক সমাবেশে গিয়ে ছবি তুলতে। কোথাও কোথাও সংগ্রহ করা হচ্ছে সদস্যপত্র বা সমর্থনপত্রও।
কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে মানসিক অবসাদ বা বিষণ্নতার অভিনয় করে মেডিকেল রিপোর্ট সংগ্রহের অভিযোগও উঠেছে। এমনকি একজন নিজেকে এইচআইভি আক্রান্ত বলে মিথ্যা দাবি করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
হাজার হাজার পাউন্ডে ‘গে-কেস’
বিবিসির আন্ডারকভার প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলে একটি ল ফার্ম সাত হাজার পাউন্ড দাবি করে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি আশ্বাস দেয়, আবেদন নাকচ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
আরেকজন পরামর্শক তানিজা খান নামে পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘এখন থাকার একটাই পথ খোলা আছে—গে কেস।’
তিনি জানান, আবেদনকারীদের জন্য সাক্ষাৎকার প্রস্তুতি, গল্প মুখস্থ করানো, ক্লাবে নিয়ে গিয়ে ছবি তোলা, অনুষ্ঠানের টিকিট সংগ্রহ এবং শারীরিক সম্পর্কের ভুয়া স্বীকৃতিপত্র পর্যন্ত জোগাড় করে দেওয়া হবে। এর বিনিময়ে তিনি দাবি করেন আড়াই হাজার পাউন্ড।
স্ত্রীকেও ‘লেসবিয়ান’ সাজানোর পরামর্শ
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এক পর্যায়ে আন্ডারকভার প্রতিবেদককে জানানো হয়, তিনি আশ্রয় পাওয়ার পর পাকিস্তান থেকে স্ত্রীকে যুক্তরাজ্যে আনতে পারবেন। পরে স্ত্রীকেও ‘লেসবিয়ান’ পরিচয়ে আলাদা আবেদন করানো সম্ভব।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু প্রতারণা নয়, সংগঠিত জালিয়াতির স্পষ্ট নমুনা।
কমিউনিটি সংগঠন নিয়েও প্রশ্ন
পূর্ব লন্ডনের বেকটনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামের একটি সংগঠনের সভায় ১৭৫ জনের বেশি মানুষ অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে সেখানে উপস্থিত একজন ব্যক্তি দাবি করেন, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ০.০১ শতাংশও প্রকৃত সমকামী নন।
আরেকজন বলেন, অনেকে শুধু আশ্রয় আবেদনের সুবিধার জন্য এসব অনুষ্ঠানে আসেন।
বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের হার বেশি
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় এক লাখ আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ আবেদনকারীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল।
যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে আবেদনকারীদের মধ্যে পাকিস্তানি ও বাংলাদেশিদের হার তুলনামূলক বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে পাকিস্তানিদের করা এ ধরনের ৪২ শতাংশ আবেদন অনুমোদিত হয়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
লেবার পার্টির সংসদ সদস্য জো হোয়াইট এ ঘটনাকে গুরুতর প্রতারণা বলে উল্লেখ করেছেন।
কনজারভেটিভ দলের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ বলেন, ‘এটি আশ্রয় ব্যবস্থার ভয়াবহ অপব্যবহার।’
রিফিউজি কাউন্সিলের পরিচালক ইমরান হুসেন বলেন, ‘অসাধু চক্র প্রকৃত শরণার্থীদের জীবন ও গ্রহণযোগ্যতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।’
সরকারের কঠোর বার্তা
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, প্রতারণামূলক আশ্রয় আবেদন একটি ফৌজদারি অপরাধ। প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড, আবেদন বাতিল এবং দেশ থেকে বহিষ্কারের বিধান রয়েছে।
এছাড়া নতুন নিয়মে প্রতি ৩০ মাস অন্তর এসব আবেদন পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থাও চালু করেছে সরকার।
প্রকৃত শরণার্থীদের ক্ষতি
বিশ্লেষকদের মতে, মিথ্যা কেস যত বাড়বে, প্রকৃত নির্যাতিত মানুষদের আবেদন তত বেশি সন্দেহের মুখে পড়বে। দীর্ঘ হবে তদন্ত, কঠিন হবে প্রমাণের চাপ, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সত্যিকারের আশ্রয়প্রার্থীরাই।