একজন ফুটবলারের বিদায়ী ম্যাচ সাধারণত আবেগের হয়, পারফরম্যান্সের নয়। কিন্তু লিওনেল মেসি যেন বিদায়ের রাতেও নিয়মটা নিজের মতো করে লিখলেন। ৩৯ বছর বয়সে জাতীয় দলের শেষ ম্যাচে মাঠে নেমে শুধু আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয় দেখেই থামেননি, ম্যাচের তিনটি গোলেই সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি। দুটি অ্যাসিস্টের পর নিজেই করেছেন একটি গোল।
ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিট গোলশূন্য থাকলেও মেসিকে নিষ্প্রভ বলা যাবে না। বরং আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বিপজ্জনক আক্রমণগুলোর কেন্দ্রেই ছিলেন অধিনায়ক। প্রথমার্ধে তিনি চারবার গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন। এর মধ্যে ২৬ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে সরাসরি গোলের সুযোগও পেয়েছিলেন। বেনিনের গোলরক্ষক মার্সেল দানজিনু সেখানে দারুণ সেভ করে মেসিকে হতাশ করেন।
ম্যাচের শুরুতেই মেসির প্রথম শট অন টার্গেট আসে। এরপরও বারবার আক্রমণের শেষ ধাপে দেখা গেছে তাকে। অর্থাৎ বয়স ৩৯ হলেও শেষ ম্যাচে মেসি নিছক আনুষ্ঠানিকতার জন্য মাঠে ছিলেন না, তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই খেলেছেন।
ম্যাচের দশম মিনিটে ঘটে বিদায়ী রাতের অন্যতম আবেগঘন দৃশ্য। রেফারি খেলা থামিয়ে দেন। ৮৫ হাজারের বেশি দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে মেসিকে দীর্ঘ সময় ধরে অভিবাদন জানান। গ্যালারিতে তখন শুধু মেসির নাম। করতালি, স্লোগান আর আবেগে থেমে যায় মনুমেন্টাল।
কিন্তু সেই আবেগের মুহূর্ত শেষ হওয়ার পর মেসি আবার ফিরে যান ম্যাচের বাস্তবতায়। এখানেই তার বিদায়ী ম্যাচের বিশেষত্ব- মাঠে তিনি ছিলেন আবেগের কেন্দ্র, কিন্তু খেলায় নিজেকে আবেগের মধ্যে আটকে রাখেননি।
প্রথমার্ধে গোল না পাওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের চিত্র বদলে দেন মেসি। ৪৮ মিনিটে তার নেওয়া কর্নার কিক থেকে গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। মেসির কর্নারটি বক্সের বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছায়, আর ছুটে এসে ভলিতে সেটি জালে পাঠান ওতামেন্দি। গোলের পর দুজনের আলিঙ্গনও হয়ে ওঠে রাতের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য।
এখানে মেসির বড় গুণটি আবারও দেখা গেছে। সেট-পিসে তার নিখুঁত ডেলিভারি আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে এগিয়ে দেয়। গোলটি হয়তো ওতামেন্দির নামে, কিন্তু আক্রমণের পরিকল্পনা ও শেষ পাসের কৃতিত্ব মেসির।
এরপর আরও একবার মেসির সৃজনশীলতা। নিকো পাজকে বল বাড়িয়ে দেন তিনি। বক্সের বাইরে থেকে পাজের নেওয়া শট জালে জড়ায়। ফলে ২-০ এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মেসি বুঝিয়ে দেন, গোল করার চেয়েও বড় ভূমিকা তিনি রাখতে পারেন অন্যকে গোল করানোয়।
দুটি গোল করানোর পর মেসি নিজেই গোল করলেন। বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার পাওয়া পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন অধিনায়ক। স্পট কিক থেকে বল জালে পাঠিয়ে করেন ম্যাচের তৃতীয় গোল। এটাই ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ গোল এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এটা তার ১২৬তম গোল।
হাঙ্গেরির বিপক্ষে ২০০৫ সালে অভিষেক। সেই ম্যাচেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাল কার্ড দেখে শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। এরপর ২১ বছরে কত উত্থান-পতন, কত সমালোচনা, কত হতাশা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়- সব পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জয়।
বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটি তাই নিছক একটি প্রীতি ম্যাচ ছিল না। এটি ছিল একটি যুগের শেষ। ২০৮তম ম্যাচে এসে মেসি জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন জয় দিয়ে। তার বিদায়ী ম্যাচের আগে ২০৭ ম্যাচে ছিল ১২৫ গোল ও ৬৮ অ্যাসিস্ট, শেষ ম্যাচের দুটি অ্যাসিস্ট ও একটি গোল সেই পরিসংখ্যানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।