প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতি, পরিকল্পনা, প্রকল্প, কমিটি ও কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা হলেও সেখানে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ কতটা থাকে—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল ‘Tornado Sakib Lionel’-এ একটি খোলা আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার এই বক্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
নিজের বক্তব্যে সাকিব সরকারের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, অথচ সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব থাকবে না—এটি প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তার মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনের বাস্তবতা, প্রতিদিনের সংগ্রাম, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, প্রয়োজন ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ধারণা রয়েছে তাদের নিজেদেরই। ফলে তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে কোনো নীতি বা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।
সাকিবের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি মনে করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে এমন কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের একজন প্রতিনিধিকে কোনো কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করলেই প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না। বরং বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে যোগ্য, দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সক্রিয় ব্যক্তিদের নীতিনির্ধারণী কমিটি, পরামর্শক বোর্ড, টাস্কফোর্স, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামোতে সরাসরি যুক্ত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কেবল একজন সুবিধাভোগী নন। তিনি একজন নাগরিক, ভোটার, করদাতা, পেশাজীবী, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা কিংবা শিক্ষার্থীও হতে পারেন। রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে দেশের উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় তারও সমান অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে।
সাকিবের এই বক্তব্যের মূল সুর—প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য শুধু ‘তাদের নিয়ে’ সিদ্ধান্ত নয়, বরং ‘তাদের সঙ্গে নিয়ে’ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী কমিটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরাসরি সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি কমিটি ও টাস্কফোর্সে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কোনো নীতি, আইন, প্রকল্প বা কর্মসূচি গ্রহণের আগে তাদের সঙ্গে বাধ্যতামূলক পরামর্শ ও কার্যকর অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তার মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের দেশের উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষ করে যারা নিজেদের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে শিক্ষা, সাংবাদিকতা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, নেতৃত্ব ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
সাকিবের এই দাবি শুধু একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নয়—এটি দেশের বৃহৎ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে। কারণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় যাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাদের কতটা জায়গা দেওয়া হচ্ছে—সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে অন্তর্ভুক্তির বাস্তবতা।
জন্ম থেকেই দুই হাতের কবজি পর্যন্ত নেই সাকিবের। ডান পায়ের হাঁটুর নিচের অংশও অনুপস্থিত। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার জীবনের পথকে কঠিন করে তুললেও থেমে থাকেননি তিনি। কৃত্রিম পা ব্যবহার করে চলাফেরা করেন এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থেকে সমাজের নানা অসংগতি ও মানুষের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই সাকিব মনে করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হলে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
তার ভাষায়, ‘আমরা করুণা চাই না, দয়া চাই না। আমরা চাই সমান মর্যাদা, সমান অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে একটি সম্মানজনক জায়গা।’
সাকিবের আহ্বানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো—প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু সহায়তা দেওয়ার বিষয় হিসেবে না দেখে তাদের রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা। তার মতে, অন্তর্ভুক্তি মানে শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুযোগ তৈরি করা নয়; বরং তাদের কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণের অংশ করে নেওয়া।
তাই তার খোলা আহ্বান—‘আমাদের বিষয়ে আমাদের ছাড়া নয়।’
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত যেকোনো নীতিনির্ধারণী কমিটি, পরামর্শক বোর্ড, টাস্কফোর্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে তাদের সরাসরি, কার্যকর ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হোক। আর এমন একটি অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে সেটিই হতে পারে বৈষম্যহীন, মানবিক ও সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।