তিনি মন্তব্য করেছেন যে, রাষ্ট্র এখন তরুণদের একটি সুস্থ কর্মজীবনে প্রবেশে সহায়তা করার চেয়ে তাদের বেনিফিট নির্ভর জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। সরকারের একটি বড় পর্যালোচনার (Review) নেতৃত্ব দেওয়া এই প্রবীণ রাজনীতিক জানান, বর্তমান ব্যবস্থা তরুণদের চাকরিতে যুক্ত করার চেয়ে তাদের কল্যাণ ভাতায় আটকে রাখতেই বেশি অর্থ ব্যয় করছে।
১ পাউন্ডের বিপরীতে ২৫ পাউন্ডের অসমতা
অ্যালান মিলবার্ন ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে একজন তরুণকে ভাতার ওপর নির্ভরশীল রাখতে যেখানে রাষ্ট্র ২৫ পাউন্ড খরচ করছে, সেখানে তাকে কোনো কর্মসংস্থানে যুক্ত করার পেছনে ব্যয় করছে মাত্র ১ পাউন্ড। মিলবার্নের মতে, এটি কেবল দেশের কল্যাণ ব্যবস্থার (Welfare system) ব্যর্থতা নয়, বরং সামগ্রিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থারও একটি বড় বিপর্যয়। এর ফলে তরুণরা নতুন কিছু শেখা বা স্বাধীনভাবে আয় করার সুযোগ থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে।
লেবার পার্টির আদর্শিক অবস্থান ও কর্মসংস্থানের গুরুত্ব
বর্তমান লেবার পার্টি সরকারের উদ্দেশ্যে মিলবার্ন স্মরণ করিয়ে দেন যে, 'লেবার' শব্দের মূল অর্থই হলো কাজ বা শ্রম। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার-এর কল্যাণ সংস্থা সংক্রান্ত সংস্কার পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন যে সমস্ত এমপি, তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন— কাজ কেবল আয়ের উৎস নয়, এটি মানুষের জীবনে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। কোনো তরুণ দীর্ঘ সময় ধরে কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকলে তা তার মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
‘উদ্বিগ্ন প্রজন্ম’ ও সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব
তরুণদের এই সংকটের পেছনে ডিজিটাল দুনিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন মিলবার্ন। তিনি বর্তমান প্রজন্মকে ‘দুর্বল’ বলতে নারাজ, বরং তাদের একটি ‘উদ্বিগ্ন প্রজন্ম’ (Anxious Generation) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, এই তরুণরা এমন এক ডিজিটাল পরিমণ্ডলে বড় হচ্ছে যা তাদের আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং মানসিক চাপ সামলানোর স্বাভাবিক ক্ষমতাকে বদলে দিয়েছে। সারাক্ষণ ঘরে বসে অনলাইনে সময় কাটানোর ফলে তাদের ঘুম ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা সরাসরি তাদের কাজের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
যুগের সাথে অমিল ও ব্রিটিশ ব্যবসার চ্যালেঞ্জ
আগামী সপ্তাহে প্রকাশ পেতে যাওয়া একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের সূত্র ধরে মিলবার্ন জানান, যুক্তরাজ্যের বর্তমান কল্যাণ ব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের পরিকাঠামো মূলত পূর্ববর্তী প্রজন্মের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যা এখনকার তরুণদের বাস্তব পরিস্থিতির সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই অবস্থায় ব্রিটিশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, মানসিক চাপে থাকা তরুণদের জন্য কর্মক্ষেত্রে আরও সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সাথে তিনি মনে করিয়ে দেন, অতীতে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো সহজেই বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে সংকট সামাল দিত, কিন্তু এখন সেই সুযোগ কমে আসায় স্থানীয় তরুণদের কাজে ফেরানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস (ONS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশটিতে প্রায় ৯ লাখ ৫৭ হাজার তরুণ কোনো ধরনের কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের (NEET) মধ্যে ছিল না, যা মোট ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ১২.৮ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরাও। তাদের মতে, কেবল সরকারি ভাতা দিয়ে তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা অসম্ভব; বরং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। কমিউনিটির প্রতিনিধিরা মনে করেন, তরুণদের ঘরে বসে থাকার অভ্যাস দূর করে কাজের পরিবেশে ফিরিয়ে আনা দরকার, অন্যথায় তাদের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। একই সাথে তরুণদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।