যুক্তরাজ্যে 'জিরো-আওয়ার্স' (Zero-hours contract) চুক্তি নিষিদ্ধের সরকারি পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও দারিদ্র্যবিরোধী প্রচারণা গোষ্ঠী ব্যবসায়ীদের চাপ উপেক্ষা করে এই চুক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে। পক্ষান্তরে, ব্যবসায়ী নেতারা দাবি করছেন, এমন সিদ্ধান্ত কর্মসংস্থান কমিয়ে দেবে এবং তরুণদের চাকরির সুযোগ সংকুচিত করবে।
শ্রমিক ও দারিদ্র্যবিরোধী সংগঠনগুলোর চাপ
চাইল্ড পভার্টি অ্যাকশন গ্রুপ এবং ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (টিইউসি)-সহ আটটি প্রধান সংগঠন দেশটির ব্যবসা ও বাণিজ্য বিভাগে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে জিরো-আওয়ার্স চুক্তি বন্ধের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। তাদের মতে, এই ধরনের চুক্তির কারণে কর্মীরা স্থায়ী আয় ও কাজের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রাকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
সরকারি সিদ্ধান্তের বিলম্ব ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত বছর যুক্তরাজ্যে 'এমপ্লয়মেন্ট রাইটস অ্যাক্ট' আইন পাস হলেও এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সরকার ধাপে ধাপে নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। ব্যবসা বিষয়ক সচিব পিটার কেইল জিরো-আওয়ার্স চুক্তি নিয়ে অংশীজনদের সাথে আলোচনার প্রক্রিয়াটি কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, এখন ধারণা করা হচ্ছে গ্রীষ্মের শেষের দিকে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হবে এবং আগামী বছর নাগাদ নতুন নিয়ম কার্যকর হতে পারে।
ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগ ও আপত্তি
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নতুন নিয়ম চালু হলে কর্মক্ষেত্রে নমনীয়তা (flexibility) কমে আসবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে পড়বে। 'ব্রিটিশ রিটেল কনসোর্টিয়াম' এবং আতিথেয়তা খাতের সংগঠন 'ইউকেহসপিটালিটি' সরকারকে সতর্ক করে বলেছে, কঠোর কর্মসূচি চাকরির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। 'ইনস্টিটিউট অব ডিরেক্টর্স'-এর এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৮৬ শতাংশ ব্যবসায়ী নেতা মনে করেন, এই নতুন কর্মসংস্থান আইন যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান 'নেক্সট'-এর চেয়ারম্যান লর্ড ওলফসন এ প্রসঙ্গে বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জিরো-আওয়ার্স চুক্তি বন্ধ হওয়া উচিত হলেও খুচরা (retail) খাতে এটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে।
সংকটে লাখো কর্মী
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ জিরো-আওয়ার্স চুক্তির আওতায় কাজ করছেন। বিশেষ করে হাসপাতাল, গুদাম (warehouse), রেস্তোরাঁ এবং আতিথেয়তা (hospitality) খাতে এই ধরনের কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।
টিইউসি-এর মহাসচিব পল নোয়াক বলেন, বহু কর্মী বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও এখনো স্থায়ী কর্মঘণ্টা বা নিশ্চিত আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন না। অনিশ্চিত কর্মঘণ্টার কারণে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে বাজেট করতে পারে না এবং সন্তানদের দেখাশোনা করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কর্মীরা সবসময় চাকরি হারানো বা কাজের ঘণ্টা কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় থাকেন।
দারিদ্র্যবিরোধী কর্মী অ্যালিসন গার্নহাম যোগ করেন, হঠাৎ শিফট বাতিল হওয়া বা কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ার কারণে অনেক অভিভাবক তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েন। নতুন আইন কার্যকর হলে কর্মীরা নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও আগাম শিফটের তথ্য পাবেন, যা শিশু দারিদ্র্য কমাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কর্মীদের জন্য নিশ্চিত আয় ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করতেই এই নতুন কর্মসংস্থান আইন আনা হচ্ছে। যোগ্য কর্মীদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন নিয়মটি যেন বাস্তবসম্মত হয়, সেজন্য কর্মী ও নিয়োগদাতা—উভয় পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে।