মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই অনুসন্ধানে বলা হয়, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে, তাদের লক্ষ্য করেই এসব প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এদের বড় অংশই বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নাগরিক।
নিজ দেশে ফিরলে সমকামী পরিচয়ের কারণে প্রাণনাশের ঝুঁকি আছে এমন মিথ্যা দাবি দেখিয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করানো হচ্ছে তাদের মাধ্যমে।
বিবিসির অনুসন্ধানের প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, “যারা আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কারসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নিজ দেশে ফিরে গেলে যারা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, তাদের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের আশ্রয়প্রক্রিয়া সুরক্ষা দিয়ে থাকে।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু ল ফার্ম অতিরিক্ত ফি নিয়ে ব্যবস্থা অপব্যবহার করছে।
ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসা অনেক অভিবাসীর কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তাদের সাক্ষাৎকারে কীভাবে কথা বলতে হবে তা শেখানো হচ্ছে, এমনকি জাল ছবি, সুপারিশপত্র ও চিকিৎসা নথি তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশের অভিবাসীদের টার্গেট করা হচ্ছে, যেখানে সমকামিতা আইনত নিষিদ্ধ।
জালিয়াতির শিকার এসব অভিবাসীরা মূলত পড়াশোনা, কাজ বা ভ্রমণ ভিসায় যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
গত বছর যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশই এসব ভিসা ক্যাটাগরি থেকে আসা।
বিবিসির সাংবাদিকরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে কয়েকটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যগুলো হলো-
ভুয়া প্রমাণপত্র ও ছবি: একটি ল ফার্ম ভুয়া আশ্রয় আবেদনের জন্য ৭ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দাবি করে। তাদের দাবি, এতে হোম অফিসে আবেদন বাতিলের ঝুঁকি “খুবই কম” থাকে।
শারীরিক সম্পর্কের সাজানো গল্প: এক ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট দাবি করেন, তিনি ১৭ বছর ধরে এ ধরনের আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছেন।
তিনি এমনকি ক্লায়েন্টের সঙ্গে সমকামী সম্পর্ক ছিল এমন দাবি করার জন্য ভুয়া ব্যক্তির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন।
চিকিৎসা তথ্য জালিয়াতি: আশ্রয়প্রার্থীদের কেউ কেউ বিষণ্ণতার ভান করছেন এবং কেউ কেউ মিথ্যা এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার দাবি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্ত্রীর জন্য লেসবিয়ান পরিচয় তৈরির প্রস্তাব: পাকিস্তানি পরিচয়ে কথা বলা ছদ্মবেশী সাংবাদিককে বলা হয়, তিনি আশ্রয় পাওয়ার পর স্ত্রীকে যুক্তরাজ্যে আনতে পারবেন, এবং তার ক্ষেত্রেও লেসবিয়ান পরিচয় ব্যবহার করে আবেদন করা যাবে।
‘এখানে কেউ সমকামী নয়’
পূর্ব লন্ডনের বেকটনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামের একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানে ১৭৫ জনের বেশি মানুষ অংশ নেন।
সংগঠনটি নিজেদের সমকামী ও লেসবিয়ান আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তাকারী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দেয়।
তাদের ওয়েবসাইটে বলা আছে, তারা কেবল প্রকৃত সমকামী আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা করে।
তবে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন ছদ্মবেশী সাংবাদিককে জানান, সেখানে প্রকৃত সমকামী খুবই কম।
ফাহার নামের একজন বলেন, “এখানে যারা আছে তাদের অধিকাংশই সমকামী নয়।”
জিসান নামের আরেকজন বলেন, “এখানে কেউ সমকামী নয়। ১ শতাংশও না।”
যেভাবে কাজ করে চক্রটি
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বিবিসির ছদ্মবেশী সাংবাদিকরা অনুসন্ধান শুরু করেন। এতে তানিসা খান নামের এক পরামর্শদাতার নাম উঠে আসে।
তানিসার সঙ্গে কথা বলার সময় ছদ্মবেশী সাংবাদিক উর্দুতে কথা বললে তিনি সহায়তায় আগ্রহ দেখান। যখন জানানো হয় সাংবাদিক আসলে সমকামী নন, তখন তিনি বলেন, “আমার কথা শুনুন, এখানে কেউ আসল নয়। টিকে থাকার একমাত্র উপায় এটিই।”
তিনি আরও বলেন, সমকামী কি না তা যাচাইয়ের কোনো বাস্তব উপায় নেই সবকিছু নির্ভর করে সাক্ষাৎকারে দেওয়া বক্তব্যের ওপর। তিনি ভুয়া ক্লাবে যাওয়ার ছবি, ভুয়া চিঠি এবং যৌন সম্পর্কের প্রমাণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্যাকেজ’ তৈরির প্রস্তাব দেন। এর জন্য তিনি শুরুতে ২ হাজার ৫০০ পাউন্ড দাবি করেন। এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ একজন অভিবাসন আইনজীবীকে দেখানো হলে তিনি একে “স্পষ্ট জালিয়াতি” বলে মন্তব্য করেন।
আবেদন সংখ্যা
ঠিক কতজন এভাবে ভুয়া আবেদন করছেন তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে পাকিস্তানিদের হার বেশি। ২০২৩ সালে এ ধরনের ৩,৪৩০টি আবেদন প্রাথমিক সিদ্ধান্তে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ১,৪০০টি ছিল নতুন আবেদন। আবেদনকারীদের মধ্যে ৪২ শতাংশ ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক, এবং গত পাঁচ বছরে দেশটি শীর্ষে রয়েছে।
যৌনতার ভিত্তিতে আশ্রয় আবেদনের সাম্প্রতিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে এই ধরনের আবেদন প্রবণতা বেড়েছে। ২০২৩ সালে যৌন নিপীড়নের ঝুঁকি দেখিয়ে করা আশ্রয় আবেদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রাথমিক পর্যায়ে অনুমোদন পেয়েছে।