জীবনসংগ্রামের কঠিন পথ পেরিয়ে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভেঙে না পড়া এই নারী। জীবনের প্রতিটি ধাপে দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে লড়াই করেও তিনি হার মানেননি। তার জীবন যেন হার না মানা মায়েদের এক অনুপ্রেরণার গল্প।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগমের জন্ম ১৯৬১ সালে। ১৯৭১ সালে যখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী তখন শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের ভয়াবহতা আর হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। যুদ্ধের কারণে ইতি টানতে হয় তার শিক্ষা জীবনের।
এর পর ১৯৭৫ সালে বাবাকে হারানোর শোক কাটতে না কাটতেই একই বছর বিয়ে হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিন হোসাইনের সঙ্গে। সংসার জীবনে প্রথম দুই কন্যাসন্তান অল্প বয়সেই মারা যায়। এরপরও থেমে থাকেননি তিনি।
১৯৮৪ সালে তৃতীয় কন্যাসন্তান, ১৯৮৬ সালে এক পুত্রসন্তান এবং ১৯৯১ সালে আরেক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু ২০০২ সালে স্বামী স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইজড অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে রোকেয়া বেগমের জীবনে নতুন করে নেমে আসে কালো মেঘ।
স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানো সবকিছুই হয়ে ওঠে কঠিন। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। মানুষের বাসায় কাজ করে এবং আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যান।
তার সেই ত্যাগ আর সংগ্রামের ফল আজ সাফল্যের গল্প হিসেবে ধরা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বড় মেয়ে আইরিন আক্তার ৩৫তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে বর্তমানে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত আছেন। ছেলে মোহাম্মদ মইনুল হোসেন চৌধুরীও সরকারি প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করছেন। ছোট মেয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ৩৯তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন এবং বর্তমানে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন।
ছেলে মোহাম্মদ মইনুল হোসেন চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের অনুপ্রেরণা শুধু আমাদের মা। আমাদের নিয়ে আমার মায়ের স্বপ্ন আজ আমাদের আলোকিত করেছে। মায়ের কষ্ট, সীমাহীন শ্রম আজ আমাদের স্বপ্নের শিকড়ে পৌঁছে দিয়েছে। আজকে আমরা তিন ভাই বোন দেশসেবা করার সুযোগ পেয়েছি। এটা একান্ত মায়ের সাধনার ইচ্ছেে ফসল।
অদম্য নারীদের নিয়ে ঢাকা পোস্ট চট্টগ্রাম অফিসের নিয়মিত আয়োজন ‘কন্যা থেকে জননী’—নারীর জীবনসংগ্রাম আর গৌরবের কাহিনি। এই আয়োজনের এবারের পর্বে ঢাকা পোস্টকে সন্তানদের আলোকিত করার গল্প শোনান রোকেয়া বেগম।
তিনি বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর ১০-১২ বছর খুব কষ্ট করেছি। অনেক সময় না খেয়ে থেকেছি, মানুষের বাসায় কাজ করেছি। শুধু সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছি। আজ তারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি।
তিনি আরও বলেন, আমি চাই আমার সন্তানরা দেশের মানুষের জন্য কাজ করুক, সাধারণ মানুষের উপকারে আসুক।