রাউজানের নামের গভীরে লুকিয়ে আছে রাজকীয় আভিজাত্য। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬৬৬ সালে মুঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের আগে এ অঞ্চল ছিল আরাকান রাজত্বের অংশ। আরাকানি ভাষায় একে বলা হতো ‘রজোওয়াং’ বা রাজপরিবারের ভূমি। এই ‘রজোওয়াং’ শব্দটিরই বিবর্তিত রূপ আজকের ‘রাউজান’।
রাউজানের ঐতিহ্যের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালকটি হলো পাহাড়তলী গ্রামের ‘মহামুনি বৌদ্ধ বিহার’। ১৮০৫ থেকে ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এই বিহারটি প্রায় দুইশ বছরের পুরনো। অনুচ্চ টিলার ওপর স্থাপিত এই বিহারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রখ্যাত বৌদ্ধ ধর্মগুরু চাইংগা ঠাকুর।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই স্থানের পবিত্রতা অনন্য। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশায় তার যে পাঁচটি প্রতিমূর্তি তৈরি করা হয়েছিল, তার মধ্যে মায়ানমারের মহামুনি বুদ্ধ মূর্তির আদলে এটি নির্মিত। এখানে এলে দেখা যায় শৈল্পিক কারুকার্যখচিত বুদ্ধমূর্তি, যা পর্যটক ও পুণ্যার্থীদের মন কেড়ে নেয়।
রাউজানের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ ‘মহামুনি মেলা’। ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মং সার্কেল রাজার হাত ধরে শুরু হওয়া এই মেলা আজও চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী পালিত হয়। এটি কেবল বৌদ্ধদের উৎসব নয়, বরং হিন্দু, মুসলিম ও আদিবাসীদের এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়। চৈত্র সংক্রান্তির সকালে হাজার হাজার মানুষের ফুল পূজা, প্রদীপ পূজা আর বিশ্বশান্তির প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে মহামুনি প্রাঙ্গণ। মেলায় পাহাড়ের জুমচাষিদের তৈরি পণ্য থেকে শুরু করে লোকজ হস্তশিল্পের এক বিশাল বাজার বসে।
রাউজান মানেই বীরত্বের ইতিহাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনের জন্মস্থান এই রাউজানেই। বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদ আজও বিপ্লবের প্রেরণা জোগায়। এখানকার ‘সূর্য সেন পল্লী’ ইতিহাসের ছাত্র আর পর্যটকদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ।
প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকেও রাউজান অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ডাবুয়া ও হলদিয়া এলাকার দিগন্তজোড়া রাবার বাগান দেখলে মনে হয় যেন সবুজের চাদর বিছিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়া ডাবুয়া এলাকার প্রাচীন জমিদার বাড়ি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিনোদনের জন্য কর্ণফুলী নদীর তীরের লাম্বুরহাটে অবস্থিত কর্ণফুলী শিশু পার্কটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
রাউজানের অর্থনীতি কৃষি, বাণিজ্য আর শিল্প, তিনটির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। রাবার উৎপাদন ও কৃষি গবেষণায় এই উপজেলা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে এটি শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতাভুক্ত একটি উন্নত জনপদ। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চট্টগ্রাম শহরের অক্সিজেন মোড় বা কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে খুব সহজেই এই ঐতিহাসিক জনপদে যাতায়াত করা যায়।
শিক্ষা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের মিশেলে রাউজান এক অনন্য জনপদ। পাহাড়তলীর মহামুনি বিহারের ঘণ্টা আর হালদার স্রোত যেন আজও বলে যায় এক প্রাচীন সভ্যতার গল্প।