তবে সংবিধান ও জাতীয় শিক্ষানীতির এই অঙ্গীকারের পরও দেশের অনেক শিশু এখনো শিক্ষা অধিকার থেকে বঞ্চিত। দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু বিদ্যালয় দুর্বল অবকাঠামো ও সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাজধানী ঢাকার ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দীর্ঘদিন ধরে এমন দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে।
মিরপুর-১৫ নম্বরের ভাষানটেক এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকার ‘ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প’ চালু করে। প্রকল্পের আওতায় আবাসন সুবিধার পাশাপাশি থানা, মসজিদ ও মন্দির, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, খেলার মাঠ এবং মাদ্রাসা রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের বাসিন্দাদের শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখনো সরকারিকরণ হয়নি। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বিদ্যালয়টির অবকাঠামোও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ভূমি মন্ত্রণালয় ২০১০ সালে ‘বিআরপি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করে। প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৬ হাজার মানুষের বসবাস। তাঁদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ জনে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে করোনা মহামারির আগে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী ভর্তি ছিল। তবে বিদ্যালয়ের শোচনীয় অবকাঠামো ও জরাজীর্ণ পরিবেশের কারণে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের ভর্তি কমতে থাকে। বর্তমানে প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাঁদের পাঠদানের জন্য রয়েছেন ১১ জন শিক্ষক। শিক্ষকদের সবাই উচ্চশিক্ষিত, মাস্টার্স পাস এবং বিদ্যালয়ে পাঠদানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
বিদ্যালয়টির শিক্ষক ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ভবনটির অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ছাদের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির সময় সেসব ফাটল দিয়ে পানি শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পড়ে। এতে দেয়াল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির দিনে শ্রেণিকক্ষগুলো পানিতে ভিজে স্যাঁতসেঁতে ও কাদাময় হয়ে পড়ে। এমন পরিবেশে শিশুদের নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণেরও ঘাটতি রয়েছে বিদ্যালয়টিতে। শিক্ষকদের সম্মানীও পর্যাপ্ত নয়। এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ দিয়ে শিক্ষকদের সামান্য সম্মানী দেওয়া হয়।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের চারপাশে একটি অস্থায়ী সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেছিল। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে সেই বাউন্ডারি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিদ্যালয়ের একমাত্র শহীদ মিনারটিও দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। ঝড়ের সময় একটি গাছ পড়ে শহীদ মিনারটি ভেঙে যায়। এরপর এটি আর সংস্কার করা হয়নি। বর্তমানে ভাঙা ও পরিত্যক্ত শহীদ মিনারেই প্রতিদিন প্রভাতি অধিবেশন হয়। জাতীয় দিবসগুলোতে সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিদ্যালয়টিতে শিশুদের জন্য নিরাপদ পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থা নেই। রয়েছে শৌচাগারেরও সংকট। ফলে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি মৌলিক সুবিধা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যালয়ের সামনে রয়েছে একটি বড় মাঠ, যা ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে অত্যন্ত বিরল। বিদ্যালয়ের পাশেই একটি আধুনিক সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১০০ গজের মধ্যে রয়েছে একটি সরকারি কলেজ। ফলে বিদ্যমান অবকাঠামো ও আশপাশের সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যালয়টিকে পরিকল্পিতভাবে একটি আধুনিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা সম্ভব বলে মনে করেন শিক্ষক ও এলাকাবাসী।
তাঁদের মতে, ঢাকার মতো রাজধানী শহরের একটি বিদ্যালয়ের এমন করুণ অবস্থা শিশুদের শিক্ষাজীবনকে ব্যাহত করছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গড়ে ওঠা এই আবাসিক প্রকল্পে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টির সংস্কার ও উন্নয়ন জরুরি।
শিশু, অভিভাবক, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত বিদ্যালয়টির অবকাঠামো সংস্কার ও উন্নয়ন করে এটিকে সরকারিকরণ করা হোক। তাঁদের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা, মেধা ও সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যালয়টিকে ঢাকাসহ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা সম্ভব।