যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়তি শুল্ক আরোপ এবং এর জবাবে চীনের পাল্টা ব্যবস্থা বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ রপ্তানিতে চীনের বিধিনিষেধ যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন চাপে ফেলে।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরও উদ্বেগ তৈরি করে। ফলে ট্রাম্পের চীন সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আশা তৈরি হয়।
তবে বৈঠকের পর বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্য ইস্যুতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও ইরান ও তাইওয়ান প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে ভিন্ন রয়ে গেছে।
বৈঠকে শি জিনপিং ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান ইস্যু সঠিকভাবে সামাল না দিলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
শি জিনপিং আরও বলেন, “তাইওয়ানের স্বাধীনতা এবং তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি— আগুন ও পানির মতো পরস্পরবিরোধী।”
২৩ মিলিয়ন মানুষের স্বশাসিত দ্বীপ Taiwan নিজেকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও চীন এটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানকে রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিয়ে আসছে, যা বেইজিংয়ের অসন্তোষের অন্যতম কারণ।
বৈঠকের আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী অবস্থানের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়। সেখানে বলা হয়, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা প্রয়োজন।
যদিও বৈঠকের পর ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ইস্যুতে দুই নেতা “খুব কাছাকাছি অবস্থানে” রয়েছেন। তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি শি জিনপিং।
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, দুই নেতা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না থাকার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাণিজ্য আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে কিছু সীমিত অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষিপণ্য বিক্রি ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের অ-সংবেদনশীল পণ্য চিহ্নিত করার বিষয়েও কথা হয়েছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, চীন প্রায় ২০০টি বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা মার্কিন বিমান নির্মাতা Boeing-এর জন্য বড় অর্ডার হতে পারে। তবে বাজারে প্রত্যাশা ছিল আরও বড় চুক্তির। ফলে বৈঠকের পর বোয়িংয়ের শেয়ারের দর কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকে বড় ধরনের কোনো চুক্তি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে এবং চীনের শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
তবে কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও বৈঠকের পরিবেশ ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। শি জিনপিং ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে একটি গোপন বাগান ঘুরিয়ে দেখান এবং তার সম্মানে জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম চীন সফরে গিয়ে ট্রাম্পকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয় বেইজিং।
বৈঠকের ফাঁকে ট্রাম্প চীনের প্রশংসা করে বলেন, “আমি চীনকে দেখে খুবই মুগ্ধ।”
এদিকে ট্রাম্প শি জিনপিংকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি বেইজিং।