পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক উত্তাপ এখনো প্রশমিত হয়নি। বরং ভোটে অনিয়ম, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর), গণনা প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার অভিযোগকে সামনে এনে এবার জাতীয় স্তরে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে কালীঘাটে বৈঠকে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শুধু রাজ্যের ভেতরে নয়, দিল্লিতেও এই ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে নামতে চায় তৃণমূল। আর সেই আন্দোলনে কংগ্রেস-সহ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকদের পাশে পেতেই এখন জোর দিচ্ছে তৃণমূল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিকে শুধু বাংলার আঞ্চলিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় গণতন্ত্র ও নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে তৃণমূল। ফলে দিল্লিতে সম্ভাব্য কর্মসূচি কেবল প্রতিবাদ নয়, বরং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী ঐক্যের নতুন বার্তাও হয়ে উঠতে পারে।
কালীঘাটের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন লোকসভা ও রাজ্যসভার সংসাদ সদস্যরা। যদিও সূত্র বলছে, দুই কক্ষেরই কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাংসদ এদিন অনুপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রথমেই ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে দলের অভিযোগগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। এসআইআর থেকে শুরু করে ভোট গণনা পর্যন্ত একাধিক স্তরে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি সংসাদ সদস্যদের সতর্ক করেন, আক্রান্ত কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার লিখিত ও অনলাইন অভিযোগ নথিভুক্ত করে রাখতে হবে।
দলের একাধিক সংসাদ সদস্যদের মধ্যে বৈঠকে দাবি করেন, বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা হয়েছে। কোথাও কোথাও ঘরছাড়া হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এই প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য প্রতিমা মণ্ডল বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত কর্মীরাই এখন রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের প্রকাশ্যে সেখানে যেতে নিরুৎসাহিত করছেন। পরিস্থিতি এখনও উত্তপ্ত থাকায় ভয় ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এসময় বলেন, সব অভিযোগ নথিভুক্ত রাখতে হবে। ভবিষ্যতে আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে তিনি দলের সাংসদদের মনে করিয়ে দেন, এ ধরনের আক্রমণের জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তারপরও ৮০টি আসনে জয় প্রমাণ করে, কঠিন লড়াই হয়েছে। দলের আইনজীবী-সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বৈঠকে দিল্লিতে ধর্না বা অবস্থান কর্মসূচির প্রস্তাব দেন। অতীতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো যেভাবে সংসদ চত্বরে আন্দোলন করেছে, তৃণমূলও এবার একই পথ নিতে চায় বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
জবাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে এবং ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূলের এই অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গত কয়েক বছরে কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব এবং বিরোধী রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রশ্নে টানাপোড়েনের কারণে তৃণমূল ও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিজেপি-বিরোধী বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে চলে এসেছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলোর অভিন্ন অভিযোগ এখন এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
অন্যদিকে বিজেপি অবশ্য তৃণমূলের অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, ৪ মে'র পর থেকে যারা বিজেপির পতাকা নিয়ে হামলা চালাচ্ছেন, তাদের অনেকেই প্রকৃত বিজেপি কর্মী নন। তিনি পালটা প্রশ্ন তোলেন, যদি সত্যিই কেউ আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে শুধু সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ না তুলে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো হচ্ছে না কেন?
বৈঠকে সাংগঠনিক পরিবর্তনের বিষয়ও সামনে আসে। লোকসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক পদ থেকে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে সরিয়ে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
রাজনৈতিক সূত্রে খবর, ভোট-পরবর্তী সময়ে সমাজমাধ্যমে কাকলির ছেলের একটি পোস্ট ঘিরে দলের অস্বস্তিই এই সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ হতে পারে। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি হয় যখন কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র মন্তব্য করেন, ভোট গণনার দিন পুরনো তৃণমূল কর্মীরাই শেষ পর্যন্ত মাঠে ছিলেন, কিন্তু ২০১১ সালের পর দলে আসা অনেকে মাঝপথে সরে যান। যদিও মমতা সঙ্গে সঙ্গেই তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, এখন এসব আলোচনার সময় নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতারও ইঙ্গিত বহন করে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দলে যুক্ত হওয়া নতুন নেতৃত্ব ও পুরনো সংগঠনের মধ্যে দূরত্বের প্রশ্ন ভোট-পরবর্তী সময়ে আবার সামনে এসেছে।
এদিকে শুক্রবার কালীঘাটে পরাজিত প্রার্থীদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক ডাকছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই দিনে বিধানসভায় স্পিকার নির্বাচনের অধিবেশনেও যোগ দেবেন নবনির্বাচিত তৃণমূল বিধায়কেরা। যদিও পরিষদীয় দলের বৈঠক না হওয়ায় কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।সব মিলিয়ে, তৃণমূল এখন একদিকে রাজ্যে সংগঠনকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ভোটে অনিয়ম ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছে। আর সেই লড়াইয়ে ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে পাশে টানার মধ্য দিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ার ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।