বয়সের ভারে নুয়ে পড়া আলো রানীর ঘরটির চাল এতটাই জরাজীর্ণ যে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর। ফুটো চাল দিয়ে নামা বৃষ্টির পানি ঠেকাতে কখনো বালতি, কখনো হাঁড়ি-পাতিল, আবার কখনো পলিথিন বিছিয়ে রাখতে হয়। একসময় যে ঘর ছিল পরিবারের আশ্রয়, সেটিই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
অথচ নিজের নামে সরকারি খাসজমি বরাদ্দ রয়েছে তাঁর। ১৯৯০-এর দশকে স্থায়ী আশ্রয়ের আশায় ১৫ শতাংশ খাসজমি বন্দোবস্ত পেয়েছিলেন আলো রানী। কিন্তু প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই জমির দখল পাননি তিনি। ফলে কাগজে নিজের জমি থাকলেও বাস্তবে অন্যের জমিতে বসবাস করতে হচ্ছে তাঁকে।
অন্যের জমিতে শুরু, সেখানেই শেষের অপেক্ষা
প্রায় চার দশক আগে স্বামী ও আট সন্তান নিয়ে চরম অভাবের মধ্যে পড়েছিলেন আলো রানী। তখন প্রতিবেশী রহমত উল্লাহ বেপারী মানবিকতার হাত বাড়িয়ে নিজের জমিতে তাঁদের একটি ঘর তুলে দেন। সেই ঘরেই কেটেছে পরিবারের দীর্ঘ সময়।
এরপর স্বামী মারা যান। সন্তানদেরও বিয়ে হয়ে যার যার সংসার হয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলো রানীর জীবন হয়ে উঠেছে আরও একাকী। সন্তানদের সংসারে বোঝা হতে চান না তিনি। তাই ভাঙাচোরা সেই ঘরেই একা দিন কাটাচ্ছেন।
তবে ঘরটির বর্তমান অবস্থা এতটাই নাজুক যে সেখানে বসবাস করাই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টির সময় পানি পড়া তো নিত্যদিনের ঘটনা। কখন ঘরের কোনো অংশ ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে, সেই আতঙ্কও রয়েছে।
সংবাদ প্রকাশের পর পাশে প্রশাসন
আলো রানীর এই অসহায় জীবনের গল্প পরে বিষয়টি নজরে আসে ধামরাই উপজেলা প্রশাসনের।
এরপর তাঁর পাশে দাঁড়ায় উপজেলা প্রশাসন। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে আলো রানীর জরাজীর্ণ ঘরটি মেরামতের জন্য ঘরের টিন সরবরাহ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর নিজের দুর্দশার কথা প্রশাসনের নজরে আসায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বৃদ্ধার জীবনে।
প্রশাসনের এই উদ্যোগে আলো রানীর ভাঙা ঘরটি অন্তত কিছুটা নিরাপদ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর মূল সমস্যা এখনো রয়ে গেছে নিজের নামে বরাদ্দ পাওয়া ১৫ শতাংশ খাসজমির দখল।
ঘর মিললেও অপেক্ষা শেষ হয়নি
আলো রানীর জন্য নতুন টিন পাওয়া নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। কিন্তু যে বয়সে একজন মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার কথা, সে বয়সেও তাঁকে নিজের জমির দখলের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
আলো রানীর চাওয়া খুব বেশি নয়। নিজের নামে বরাদ্দ হওয়া জমিটুকু বুঝে পাওয়া এবং সেখানে ছোট্ট একটি ঘর তুলে জীবনের শেষ দিনগুলো নিরাপদে কাটানো।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তিন দশক ধরে কাগজে থাকা সেই জমি শেষ পর্যন্ত বাস্তবে আলো রানীর হাতে পৌঁছায় কি না।