ফলে এই রাইটার্স বিল্ডিংয়ে আক্রমণ করেছিলেন বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী বিনয় বদল ও দীনেশ, যাদের মূর্তি বর্তমানে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে এই ভবনের সামনের প্রাঙ্গণে। তবে তৃণমূল সরকার আসার পরে এই ভবন থেকে সচিবালয় সরিয়ে নিয়ে যান তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়।
২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস দল ক্ষমতায় আসার দুই বছর পরে এই ভবন থেকে সরে যায় অধিকাংশ সচিবালয়। হাওড়ার শিবপুরে অবস্থিত যে ভবনটিতে আগে হুগলি রিভার ব্রিজ কমিশনার ও সরকারি গার্মেন্টস বিপণন সমিতির অফিস ছিল, সেটি পরিবর্তিত হয়ে যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিবালয়ে।
নবান্ন নামের ওই ১৪তলা ভবনটির সবথেকে ওপরের ফ্লোরে নিজের দপ্তর পরিচালনা করতেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তখন অবশ্য সরকার বলেছিল, রইটার্স বিল্ডিং পুরোনো হয়েছে, ২০১৩ সাল থেকেই সেখানে মেরামতির কাজ চালাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট। সেই কাজ এখন অনেকটা এগোলেও সম্পূর্ণ হয়নি।
তবে মমতা যে নবান্ন ছেড়ে রইটার্স বিল্ডিংয়ে ফিরতে আগ্রহী, সেই কথা তিনি নিজে কখনও বলেননি। বিজেপির পক্ষ থেকে সচিবালয় ফের রাইটার্সে ফিরিয়ে নিয়ে আসার সিদ্ধান্তকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঠাট্টার ছলে বলা হচ্ছে, সরকারকে নীলবাড়ি থেকে লালবাড়িতে ফেরত নিয়ে আসা হচ্ছে।
এই মন্তব্যের সঙ্গে যোগ রয়েছে এই দুই ভবনের বাইরের রংয়ের। কিন্তু কেন ও কীভাবে রাইটার্স বিল্ডিং হয়ে উঠল ক্ষমতার কেন্দ্র?
• রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ইতিহাস
১৭৭৭ সালে টমাস লায়ন নামের একজন স্থপতি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য রাইটার্স বিল্ডিংয়ের নকশা তৈরি করেন। কোম্পানিটি ভারতে তাদের বাণিজ্যিক কার্যকলাপ আরও সুষ্ঠু করে তুলতে এবং তৎকালীন সুবা বাংলায় ব্রিটিশ-পরিচালিত কর-সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশকে এক ছাদের নিচে আনতে চেয়েছিল।
ইতিহাস বিষয়ক সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও রেডিও উপস্থাপক দীপাঞ্জন ঘোষ, যিনি মূলত পরিচিত দীপ নামে, তিনি জানালেন, যে স্থানে এখন রাইটার্স বিল্ডিং রয়েছে, সেখানে আগে ছিল একটি গির্জা। অবশ্য সেন্ট অ্যান চার্চ নামে পরিচিত গির্জাটি পরে প্রশাসনিক সুবিধার্থে ভেঙে ফেলা হয়।
ভেঙে ফেলা সেন্ট অ্যান চার্চের স্থানটি এবং এর সংলগ্ন জমিটি টমাস লায়নকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাইটার বা কনিষ্ঠ কর্মচারীদের বসবাসের জন্য ভবন নির্মাণ করতে পারেন। দীপ বলেন, সেই সময়ে সরকারি নথিপত্র হাতে লেখা হতো এবং রাইটার্স বিল্ডিং গড়ে তোলা হয়েছিল সেই কর্মচারীদের কাজ করা ও থাকার জন্য।
এই কর্মচারীদের কাজের সূত্রে তাদের পোশাকি নামকরণ করা হয় রাইটার। রাইটার্স বিল্ডিং নামটি এই রাইটারদের জন্য তৈরি হয়েছিল বলে এই নামে পরিচিত হয়।
• রাইটার্সের ইউরোপীয় সাজসজ্জা
সরকারি কর্মচারীদের বাংলায় বলা হয়, করণিক বা চলতি ভাষায়, কেরানি। যেখান থেকেই এই ভবনের বাংলা নাম মহাকরণ হয় বলে মনে করেন বহু ভাষাবিদ। রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সংরক্ষিত পুরোনো নথিপত্র থেকে জানা যায়, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সির তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এই প্রকল্পের তত্ত্বাবধান করেছিলেন।
রাইটার্স বিল্ডিং ছিল কলকাতার প্রথম তিনতলা ভবন। প্রথমে ভবনটি সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারিক উপযোগিতার কথা মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছিল। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের পুরোনো কিছু স্কেচ এই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।
তখন এই ভবনটিতে আজকের রাইটার্স বিল্ডিংয়ের মতো গ্রীক ও রোমান শৈলীর প্রতিফলন ছিল না। অলঙ্করণবিহীন, সাদামাটা এই ভবনটি যখন প্রথম চালু হয়, তখন এতে ১৯টি আবাসিক কক্ষ ছিল, যার প্রতিটিতেই জানালার তিনটি করে সারি ছিল।
দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রাইটার্স বিল্ডিং, কলকাতা: এ হিস্ট্রি অব সিটিজ ইন ফিফটি ডেজের’ প্রতিবেদক শ্রীনাথ পেরুর দাবি করেছেন, তৎকালীন সময়ে এই ভবনটি তার কদর্যতার জন্য ব্রিটিশদের আইসোর বা চোখের বিষে পরিণত হয়েছিল। বাংলার নবাবদের পতনের পরে ভারতে ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্রমশ বাড়তে থাকে, তখন ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সরকারের একাধিক দফতর এই ভবনে চলে আসতে শুরু করে।
১৮০০ সাল থেকে শুরু করে ১৮৮২ সাল পর্যন্ত একাধিক সরকারি ট্রেনিং কলেজ, রেলের সদর দফতর ও বেঙ্গল প্রভিন্সের একাধিক সচিবালয়কে এই ভবনে নিয়ে আসা হয়।
দীপাঞ্জন ঘোষ বলেন, বর্তমানে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে যে ইউরোপীয় নান্দনিকতার ছোঁয়া দেখা যায়, সেটি হয় ১৮৮২ সাল থেকে ১৮৮৯ সালের মধ্যে। তখনই রাইটার্স তার গ্রেকো-রোমান রূপটি লাভ করে।
এই স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কেন্দ্রীয় অংশের প্রবেশপথে অবস্থিত পোর্টিকো বা ইউরোপীয় ধাঁচের ছাউনি এবং ইটের তৈরি লাল রঙের বহির্ভাগ। ভিক্টোরীয় যুগের ব্রিটিশ প্রশাসন এই সরকারি ভবনটিকে ক্ষমতার এক জাঁকালো রূপক হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল, সেই লক্ষ্যেই রাইটার্সকে ফরাসি রেনেসাঁ শৈলীতে নতুন করে সাজিয়ে তোলা হয়।
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের নথি থেকে জানা যায়, এই সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে ভবনের ছাদে প্যারাপেট অর্থাৎ ইউরোপীয় রীতিতে প্রাচীর নির্মাণ করা হয় এবং ১৮৮৩ সালে ছাদের কিনারা বরাবর উইলিয়াম ফ্রেডরিক উডিংটনের গড়া একাধিক নান্দনিক ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়।
কেন্দ্রীয় পোর্টিগোটির ঠিক উপরেই স্থাপন করা হয় রোমান দেবী মিনার্ভার ভাস্কর্য। মিনার্ভা হলেন জ্ঞান, শিল্পকলা, বাণিজ্য এবং কৌশলগত যুদ্ধের দেবী, তাকে প্রায়শই গ্রিক দেবী অ্যাথেনার সমতুল্য মনে করা হয়।
• স্বাধীনতার যুদ্ধে রাইটার্স বিল্ডিং
রাইটার্স বিল্ডিং যতই ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে গড়ে উঠছিল, এই ভবনটি ততই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে শোষণের কেন্দ্র হিসেবে ধরা দিতে থাকে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ইতিহাসের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে ওই ভবনের বারান্দায় সংঘটিত অলিন্দ যুদ্ধের ঘটনটি।
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর, গুপ্ত বিপ্লবী দল বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্য বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত রাইটার্স বিল্ডিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাতে তাদের দেখতে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ভারতীয় কর্মচারীদের মতই লাগে, তা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় পোশাক পরেন তারা। তবে সেই পোশাকের মধ্যে প্রত্যেকের কাছেই লুকানো ছিল গুলিভর্তি রিভলভার।
ভবনে প্রবেশ করেই তারা কুখ্যাত পুলিশ আইজি কর্নেল এন. এস. সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন; রাজনৈতিক বন্দিদের, যাদের অধিকাংশই ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, তাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের জন্য সিম্পসন বিশেষভাবে কুখ্যাত ছিলেন।
তাকে হত্যা করার পর বিনয়, বদল ও দীনেশ ভবনটির দখল নেন এবং শিগগিরই ভবনের করিডোরগুলোতে এক তুমুল বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। কলকাতা পুলিশের বিশাল বাহিনীর সামনে টিকে থাকতে না পেরে, এই তিন বিপ্লবী দ্রুতই কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে রাইটার্স দখল বিপ্লবীদের কাছে হয়ে উঠেছিল ক্ষমতা দখলের সমতুল্য।
• স্বাধীনতার পরে রাইটার্স বিল্ডিং
ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে রাইটার্স বিল্ডিং বা মহাকরণ থেকেই রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালিত হতে থাকে। বামপন্থিদের ৩৪ বছরের শাসনকালে এই রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে বহু প্রতিবাদ, ধর্ণা ও মিছিল হয়েছে।
তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসের ৭ তারিখে তৎকালীন কংগ্রেস নেত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ওই ভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ।
তিন ঘণ্টা বিক্ষোভের পরে তাকে পুলিশ বলপ্রয়োগ করে রাইটার্স বিল্ডিং থেকে বাইরে বের করে দেয়। একাধিক সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, মমতা তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী না হলে আর কখনো রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ঢুকবেন না। নিজেকে দেওয়া সেই প্রতিজ্ঞা তিনি রেখেছিলেন। যদিও মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি রাইটার্স বিল্ডিং থেকে মাত্র দুই বছর কাজ করেছিলেন।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি যদিও রাইটার্স বিল্ডিং থেকে সরকার পরিচালনার কথা বলেছেন, তবে ১০ মে সরকার গঠন করেই বিজেপি মন্ত্রীদের পক্ষে ওই ভবন থেকে কাজ করা সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সারাইয়ের কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। তবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসকদলের অধীনে রাজ্যের পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট কাজে গতি আনলে কিছুদিন অস্থায়ী ঠিকানা থেকে কাজকর্ম চালিয়ে পরে রাইটার্সে 'শিফট' করে আসার সম্ভাবনা প্রবল বলেই মনে করা হচ্ছে।
• রাইটার্সে সচিবালয় ফেরত আনতে সমস্যা কোথায়?
দীপাঞ্জন ঘোষ জানাচ্ছিলেন, কোনো সচিবালয়ের জন্য অনেক সুরক্ষা প্রটোকল থাকে। তাই, সেই বিল্ডিংয়ের আশেপাশের অনেক রাস্তায় ব্যারিকেড ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা হয় মন্ত্রীদের সুরক্ষার জন্য।
তার মতে, রাইটার্স থেকে সচিবালয় সরে যাওয়ায় অনেক মানুষই ওই রাস্তা দিয়ে স্বাধীনভাবে যাতায়াতের সুযোগ পেয়েছেন। ওই অঞ্চলে যানজটও নিয়ন্ত্রণ করা গিয়েছে।
ফলে সচিবালয় রাইটার্সে সরিয়ে নিয়ে এলে কলকাতার ব্যস্ততম অঞ্চলগুলোতে যানজটের একটি আশঙ্কা রয়ে যায়। এ ছাড়াও নবান্ন ভবন আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি ভবন। রাইটার্সের মতো এত পুরোনো একটি ভবনকে আধুনিক যুগের কার্যকলাপ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো উপযোগী কতটা করে তোলা সম্ভব সেই নিয়েও চিন্তা প্রকাশ করেছেন দীপাঞ্জন ঘোষ।
তবে কলকাতার স্থপতি এবং প্রাচীন নির্মাণ পুনরুদ্ধার বিশেষজ্ঞ মণীশ চক্রবর্তী বলেন, একটি পুরোনো বিল্ডিং নতুন ও আধুনিক কাজের জন্য গড়ে তোলা সাধারণত একটি চ্যালেঞ্জ; কিন্তু রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে সেই সমস্যা নেই, কারণ এটি শাসনকাজ পরিচালনা করার জন্যই তৈরি।
‘‘এই বিল্ডিংটি শহরের একটি পরিচিতি। প্রত্যেকটি বিল্ডিং শুধু একটি ভবন নয়, তার পেছনে একেকটি আইডিয়া লুকিয়ে থাকে। এই বিল্ডিংয়ের স্থাপত্যের পেছনে সেই আইডিয়া হলো- ক্ষমতা। এই কারণে দিল্লির নর্থ ব্লককেও রিস্টোর করতে হয়েছে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।’’
বর্তমানে প্রত্যেকটি শহর একই রকম দেখতে হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাইটার্স বিল্ডিংয়ের অবস্থান যানবাহন চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সঠিক পরিকল্পনা করে তা নিশ্চিত করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি এটা সম্ভব। যদিও আমাদের দেশে পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মান সাধারণত খুব একটা ভালো হয় না।
‘‘এটিতে সচিবালয় ফিরিয়ে নিয়ে আসা বিশ্বের কাছে একটি বার্তা দিতে পারে যে আমরা শেয়ার্ড সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আস্থা রাখি।’’ বিবিসি বাংলা।