শুক্রবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। বিজেপি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।
ছাত্ররাজনীতি থেকে নন্দীগ্রামের আন্দোলন
পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম শুভেন্দু অধিকারীর। তার বাবা শিশির অধিকারী দীর্ঘদিন কংগ্রেস ও পরে তৃণমূল রাজনীতির পরিচিত মুখ ছিলেন। রাজনীতির শুরু ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে। পরে তিনি কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে যোগ দেন এবং দ্রুতই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।
২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবনের বড় মোড়। শিল্পাঞ্চল গঠনের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। সেই আন্দোলনই তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের ভিত নড়িয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে তৃণমূলের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করে।
এরপর সাংসদ, বিধায়ক ও রাজ্যের পরিবহন, সেচ ও পরিবেশমন্ত্রীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন শুভেন্দু। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলের অভ্যন্তরে দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে দলীয় সিদ্ধান্তে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে তার অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল।
তৃণমূল ছাড়ার সিদ্ধান্ত
২০২০ সালের শেষদিকে নাটকীয়ভাবে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই সময় তিনি দাবি করেছিলেন, তৃণমূল “এক ব্যক্তি ও এক পরিবারের দলে” পরিণত হয়েছে। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তাকে পশ্চিমবঙ্গে দলটির সবচেয়ে বড় সংগঠক হিসেবে দেখা হয়।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হন।
বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
বিরোধীদলীয় নেতা থাকাকালে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়েও একাধিকবার মন্তব্য করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। বিশেষ করে মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নানা পদক্ষেপ নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানান।
বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারকে “বাংলাদেশের বৈধ সরকার” হিসেবে উল্লেখ করতে দেখা যায় তাকে। একইসঙ্গে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তিনি কড়া অবস্থান নেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তার বক্তব্যগুলো ছিল মূলত জাতীয়তাবাদ ও সীমান্ত রাজনীতিকেন্দ্রিক।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার বক্তব্য ছিল অনেক বেশি রাজনৈতিক ও আদর্শিক। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বাস্তব প্রশাসনিক প্রয়োজন তাকে তুলনামূলক কূটনৈতিক অবস্থানে যেতে বাধ্য করতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কী অবস্থান নিতে পারেন?
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রশ্নে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সীমান্ত বাণিজ্য, অভিবাসন, পানি বণ্টন, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, এসব বিষয়ে কলকাতার অবস্থান দিল্লির নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী তিনটি বিষয়ে জোর দিতে পারেন-
প্রথমত, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ প্রশ্নে কঠোর অবস্থান। বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সীমান্ত ইস্যু তার সরকারের অগ্রাধিকারে থাকতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু উদ্বাস্তু ও মতুয়া ভোটব্যাংকের রাজনীতি আরও সক্রিয় হতে পারে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আগের চেয়ে আরও সরব ভূমিকা নিতে পারেন।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশবিরোধী সরাসরি সংঘাতমূলক অবস্থান থেকে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ পথও নিতে হতে পারে। কারণ কলকাতা ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য, চিকিৎসা, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে বড় ধরনের নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। কারণ ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতির বাইরে গিয়ে কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার সুযোগ সীমিত।
নতুন সমীকরণের পশ্চিমবঙ্গ
শুভেন্দু অধিকারীর উত্থানকে অনেকেই “বাংলার রাজনীতির পুনর্বিন্যাস” হিসেবে দেখছেন। তৃণমূলের সংগঠন কাঠামো থেকে উঠে এসে সেই দলকেই ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনাকে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় রাজনৈতিক পালাবদল বলা হচ্ছে।
একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনের সামনের সারির নেতা ছিলেন তিনি। এখন সেই শুভেন্দুই বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নবান্নে বসছেন। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের রাজনীতিতেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।