চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১ মিনিটে একটি পরমাণুচালিত সাবমেরিন থেকে পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। পরীক্ষায় একটি ডামি ওয়ারহেড (নকল পরীক্ষামূলক ওয়ারহেড) ব্যবহার করা হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্ধারিত আন্তর্জাতিক জলসীমায় সফলভাবে আঘাত হানে।
২০২৪ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষার পর এটিই চীনের প্রথম বড় কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি দেশটির বার্ষিক নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ। নিরাপত্তাজনিত কারণে ক্ষেপণাস্ত্রের মডেল বা পতনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। বেইজিংয়ের দাবি, আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। চীনের ভাষ্য, এ পরীক্ষা কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে নয়।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে এবং এটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সলোমন দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকায় গিয়ে পড়েছে। তাদের মতে, এই পরীক্ষার মাধ্যমে চীন সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা এবং দূরপাল্লার হামলার ক্ষমতা আরও জোরালোভাবে প্রদর্শন করেছে।
চীনের এই পদক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা পুরো উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই চীন দ্রুত এবং অস্বচ্ছভাবে নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে তিনি বেইজিংকে অর্থবহ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংলাপে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় চীনকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে আসছে। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার পর নতুন কোনো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় চীনকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও বেইজিং তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়াং জানিয়েছেন, ক্যানবেরাকে পরীক্ষার বিষয়ে আগে থেকেই অবহিত করা হয়েছিল। তবে তিনি বলেন, চীনের দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত স্বচ্ছতার অভাব ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
জাপানের সংবাদ সংস্থা কিয়োডোর তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ জাপানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাছাকাছি পড়তে পারে—এমন সতর্কবার্তা বেইজিং আগেই টোকিওকে দিয়েছিল। যদিও ক্ষেপণাস্ত্রটি জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে পড়েছে, তবুও ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপান সরকার।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেন, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা অনাকাঙ্ক্ষিত। তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে ‘এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর সিনিয়র ফেলো লায়েল মরিসের মতে, এই পরীক্ষা চীনের সামরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে দেশটি দেখিয়েছে, নিজস্ব উপকূলীয় জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান করেও দূরপাল্লায় কৌশলগত হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে চীনের এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া। ক্রেমলিন বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানো চীনের সার্বভৌম অধিকার এবং বেইজিং বিশ্বের কোনো দেশের জন্য হুমকি নয়। একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে চীনের নৌবাহিনীর মুখপাত্র ওয়াং শুয়েমেং বলেন, এটি একটি নিয়মিত সামরিক মহড়া এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আগাম অবহিত করা হয়েছিল।