দলীয় বিদ্রোহীদের সরাসরি ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে মমতা ঘোষণা করেছেন, তৃণমূলের অফিশিয়াল প্রতীক ‘ঘাসফুল’ তাঁর অনুগত শিবিরের কাছেই থাকবে। মমতার এই কড়া অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই প্রতীক ধরে রাখতে বিদ্রোহীদের সামনে একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
হুঁশিয়ারি দিয়ে মমতা বলেন, ‘দলের প্রতীক কোথাও যাচ্ছে না। আমাকে যদি থামাতে চান, তবে মেরে ফেলতে হবে।’
এদিকে শনিবার তৃণমূল শিবিরে লেগেছে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। মমতার অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত দলের রাজ্য সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগ করেই এই বিধায়ক যোগ দিয়েছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহী উপদলে। এই ঋতব্রতের অনুসারীরাই গত শুক্রবার কলকাতার মূল তৃণমূল কার্যালয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন।
চন্দ্রিমার দলত্যাগ নিয়ে মমতা বলেন, ‘চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য আজ পদত্যাগ করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতি এবং তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত তিনি আমাকে আগেই জানিয়েছিলেন। কারণ তাঁর ছেলেও আগে তৃণমূল-বিরোধী শিবিরের সাথে হাত মিলিয়েছিল।’
বিদ্রোহী পক্ষ থেকে মমতাকে দলের ‘উপদেষ্টা’ হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন দীর্ঘ ১৫ বছর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এই নেত্রী। তিনি সাফ জানিয়েছেন, কোনো অবস্থাতেই বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাত মেলাবেন না। মমতার দাবি, কেন্দ্রীয় এজেন্সির চাপের মুখে পড়েই বাকিরা দল ছাড়ছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিজেপির কাছে মাথা নত করব না, আর আমার দলও কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।’
তৃণমূল কার্যালয় বেহাত হওয়া প্রসঙ্গে মমতা বলেন, ‘যারা গতকাল কার্যালয়ে গিয়ে তালা ঝুলিয়েছেন, তাদের বলি— ওই অফিসটি আমরা ভাড়া নিয়েছিলাম। ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ওটা আমাদের নামে লিজ নেওয়া আছে। কেউ দল ছাড়লেই দল নামক প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত হয়ে যায় না। ওটা দলের সম্পত্তি, মা-মাটি-মানুষের সম্পত্তি। কেউ জোর করে তা কেড়ে নিতে পারবে না।’
২০১১ সালে সাড়ে তিন দশকের বাম শাসন উপড়ে ফেলা মমতা বিদ্রোহী বিধায়কদের মনে করিয়ে দেন, ‘এই প্রতীক আমার দেওয়া। ২০২৬-এর নির্বাচনে আপনাদের মনোনয়নপত্রে সই করেছিলাম আমি নিজেই। নির্বাচনের পর দুই মাস পার হতে না হতেই আপনারা কীভাবে এমন বিশ্বাসঘাতক হয়ে গেলেন? সব কিছুর একটা সীমা থাকা উচিত। আপনারা এখন বিজেপির সাথে হাত মিলিয়েছেন, যা চলতে দেওয়া যায় না।’
চন্দ্রিমার বিদায়ের পর মমতা নিজেই এখন জাতীয় ও রাজ্য— উভয় স্তরে দলের মূল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সেই সাথে ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে তাঁর নিজের কালীঘাটের বাড়িটিই হবে তৃণমূলের প্রধান কার্যালয়।
তৃণমূলে কেন এই গণ-দলত্যাগ?
মমতার নিজের পরাজয় এবং দলের ভরাডুবির পর থেকেই মূলত তৃণমূলে এই ভাঙন শুরু হয়। বিদ্রোহী বিধায়কদের অভিযোগ মমতার একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরণ নিয়ে। তবে দল ছাড়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দলে তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র অসন্তোষ।
ইতিমধ্যেই ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ক (এমএলএ), ২০ জনেরও বেশি লোকসভা সাংসদ (এমপি) এবং অন্তত ৩ জন রাজ্যসভা সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল দল থেকে আলাদা হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
দলের রাজ্য সভানেত্রী হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় পদত্যাগ করা চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য তাঁর চিঠিতে লিখেছেন, মমতার প্রতি তাঁর সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা থাকবে। তবে দল ছাড়ার পেছনে আস্থার অভাবকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘যেখানে কোনো বিশ্বাস বা আস্থা নেই, সেখানে কাজ করা সম্ভব নয়। ঠিক এই কারণেই আমরা পদত্যাগ করেছি।’
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরকে আগামী ৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে তাদের নিজ নিজ দাবি ও পাল্টা দাবির স্বপক্ষে নথিপত্র জমা দেওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে।