কিন্তু সেই আধা ঘণ্টা আর পাওয়া হয়নি।
আজ সোমবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদ আলমের মুঠোফোন বেজে ওঠে। উৎকণ্ঠা নিয়ে ফোন ধরতেই ভেতর থেকে এক নার্স বলেন, ‘ভেতরে আসেন, আপনার বাচ্চা মারা গেছে।’
ফোনে কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। হাতে তখনো শক্ত করে ধরা ছিল নাজাল ক্যানুলার নাম লেখা স্লিপ। কয়েক মিনিট আগেও কাউকে ফোনে অনুরোধ করছিলেন, দ্রুত যেন পাঠানো হয় জীবন বাঁচানোর সেই অক্সিজেন পাইপ। সাড়ে ১১ হাজার টাকার জিনিসটির আর প্রয়োজন রইল না তাঁর।
আইসিইউর ভেতরে ছিলেন শিশুটির মা ছেনোয়ারা বেগম। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আর কিচ্ছু লাগবে না…আমার মেয়ে নাই। আর কোনো অক্সিজেন পাইপ লাগবে না।’
৯ মাস বয়সী সুরাইয়া আলমের নিথর দেহ তখন হাসপাতালের ভেতরে। আর বাইরে ভেঙে পড়ছিল একটি পরিবার।
কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম পেশায় আলোকচিত্রী। সৈকতে পর্যটকদের ছবি তুলে চলত তাঁর সংসার। হামে আক্রান্ত মেয়েকে বাঁচাতে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে কয়েক দিন আগেই বিক্রি করে দিয়েছিলেন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ক্যামেরাটিও। নিজের সবকিছু উজাড় করেও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে বাঁচাতে পারলেন না তিনি।
বেলা তিনটার দিকে ছোট্ট সুরাইয়ার মরদেহ নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন মোহাম্মদ আলম, তাঁর স্ত্রী ছেনোয়ারা বেগম, শ্যালক মোহাম্মদ সাব্বির ও স্বজনেরা। ছেনোয়ারা বেগম সন্তানের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে বারবার কেঁদে উঠছিলেন। পেছনে হাঁটছিলেন মোহাম্মদ আলম। তাঁর চোখ স্থির ছিল মেয়ের মুখের দিকে। বিড়বিড় করে বলছিলেন, ‘আদরের ধন বেশি দিন থাকে না ভাই।’
হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার সংকট
আজ দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যখন কথা হচ্ছিল মোহাম্মদ আলমের সঙ্গে, তখন তিনি মেয়ের জন্য হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার খোঁজ করছিলেন। বাজারে এটি সহজে পাওয়া যায় না। দাম ১১ হাজার টাকা। কোথায় মিলবে, কার কাছে পাওয়া যাবে, কিছুই জানা ছিল না তাঁর। শুধু জানতেন, জিনিসটা দরকার।
কয়েকজন নার্সের কাছ থেকে একটি কোম্পানির প্রতিনিধির নম্বর পান তিনি। এরপর একের পর এক ফোন। অনুরোধ, যত দ্রুত সম্ভব পাঠানোর জন্য। কোম্পানির প্রতিনিধি জানিয়েছিলেন, আধা ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু সেই সময়টুকুও আর পেল না শিশুটি।
মেয়ের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোহাম্মদ আলম প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘আইসিইউ থেকে একটা বাচ্চাও কেন সুস্থ হয়ে ফিরতে পারে না? এই পাইপ ছিল না কেন? এগুলো তো আইসিইউতে থাকার কথা। লাগলে আগে কেন বলা হলো না? আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার বাচ্চাটা মারা গেল।’
সুরাইয়ার জন্য যে অক্সিজেন পাইপ আনতে বলা হয়েছিল, মোহাম্মদ আলমের হাতে থাকা কাগজে তার নাম লেখা ছিল, ‘ফিশার অ্যান্ড পায়কেল এয়ারভো ২, এইচএফএনসি সার্কিট, লার্জ সাইজ।’
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এটি রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তা করার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ যন্ত্রাংশ। এর মাধ্যমে নাকে উচ্চ প্রবাহে উষ্ণ ও আর্দ্র অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। ফলে শ্বাস নিতে সহজ হয় এবং শরীরে অক্সিজেন পৌঁছানোর প্রক্রিয়া উন্নত হয়। শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও গুরুতর শ্বাসযন্ত্রজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় এ ধরনের সার্কিট ব্যবহার করা হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু আইসিইউর মোট ২০ শয্যার মধ্যে ১৫টিতেই হাম ও উপসর্গ নিয়ে আসা শিশু ভর্তি রয়েছে। আইসিইউতে হাই ফ্লো মেশিন আছে ১২টি। এর মধ্যে অন্তত দুটিতে ফুটো রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, আইসিইউর অধিকাংশ যন্ত্রাংশ সরকারিভাবে আসে না। যেগুলো আসে, সেগুলোও প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, শিশু আইসিইউটি অনুদানে করা। সেখানে অধিকাংশ যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে চিকিৎসক কিংবা রোগীদের টাকায় কিনতে হয়। ওই শিশুকে প্রথমে একটি হাই ফ্লো মেশিন দেওয়া হয়েছিল, সেটি ফুটো ছিল। পরে আরেকটি মেশিনেও সমস্যা পাওয়া যায়। পরে রোগীর স্বজনদের কিনতে বলা হয়। তবে শিশুর অবস্থা বুঝে পরে সেটি কিনতে মানা করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘২০ শয্যার শিশু আইসিইউর ১০টি অনুদানের, ১০টি সরকারি। হাই ফ্লো মেশিন পুরো হাসপাতাল মিলিয়ে ৪১টি আছে। রোগীর পক্ষে হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা (এইচএফএনসি) কেনা সম্ভব নয়। আমি বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেব।’
সুরাইয়ার মৃত্যু ‘মিজেলস এনসেফালাইটিসে’
মোহাম্মদ আলম জানান, গত মাসে একবার জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল সুরাইয়া। তখন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঁচ দিন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরে সে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার আবার জ্বর আসে। পরে প্রথমে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার রাতেই তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়।
চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটির শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের জটিলতা থেকে তার মস্তিষ্কে প্রদাহ হয়। একে বলা হয় ‘মিজেলস এনসেফালাইটিস’।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামের পরবর্তী জটিলতা হিসেবে অনেকের মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হতে পারে। এতে উচ্চ জ্বর, খিঁচুনি, অচেতন হয়ে যাওয়া, আচরণগত পরিবর্তন এবং স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
১৪ ঘণ্টায় চার শিশুর মৃত্যু
চমেকের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, গতকাল রোববার রাত ১২টা থেকে আজ সোমবার বেলা দুইটা পর্যন্ত সুরাইয়া আলমসহ চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম ও হামের উপসর্গজনিত নিউমোনিয়ায়। এ ছাড়া আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল আরও ১৪ শিশু।
এর আগে শনিবার রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গজনিত নিউমোনিয়ায় আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়।
তবে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কাছে হাম ও হামের উপসর্গজনিত মৃত্যুর কোনো তথ্য নেই। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গতকাল রোববার সকাল ১০টা থেকে আজ সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৪৩ জন। এর মধ্যে নগরের হাসপাতালগুলোতেই ভর্তি রয়েছে ৩৯ জন।
২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর তথ্য নেই বলে জানিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। জেলায় এখন পর্যন্ত হামে নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে একজনের। উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আটজন। হাম শনাক্ত হয়েছে ১২৯ জনের শরীরে।