চারদিকে যেন উৎসবের আবহ। “মা” শব্দটিকে ঘিরে আজ হাজারো অনুভূতির গল্প। কিন্তু এই আনন্দের দিনটিই নিঃশব্দ বেদনার হয়ে ওঠে সেইসব মানুষের কাছে, যাদের মা আর পৃথিবীতে নেই। কারণ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শূন্যতার নাম– মা হারানো।
মা শুধু একজন মানুষ নন। মা মানে এক টুকরো ছায়া, এক অনন্ত শান্তি, এক নিঃস্বার্থ আশ্রয়। পৃথিবীর সব সম্পর্ক কোনো না কোনো স্বার্থে বদলে যেতে পারে, কিন্তু একজন মা সন্তানের জন্য নিজের সবকিছু নিঃশেষ করে দিতেও কখনো দ্বিধা করেন না। সন্তানের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোর জন্য একজন মা নিজের সুখ, স্বপ্ন, আরাম সবকিছু ত্যাগ করতে পারেন।
সন্তান যখন ছোট থাকে, মা তার হাত ধরে হাঁটতে শেখান। বড় হলে শেখান মানুষ হয়ে বাঁচতে। জীবনের প্রতিটি কষ্ট, ব্যর্থতা আর অন্ধকারে একজন মা-ই প্রথম সাহস হয়ে দাঁড়ান। অথচ সময়ের নির্মম নিয়মে একসময় সেই মানুষটিই হারিয়ে যান না ফেরার দেশে।
মা বেঁচে থাকলে মানুষ যত বড়ই হোক, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সে একজন সন্তান হিসেবেই বেঁচে থাকে। মাথার ওপর মায়ের দোয়া আছে এই বিশ্বাসটুকুই মানুষকে হাজার ঝড়ের মাঝেও শক্তি দেয়। কিন্তু মা চলে যাওয়ার পর মানুষ হঠাৎ করেই বুঝতে শেখে, পৃথিবীটা কতটা কঠিন, কতটা একা।
মা দিবসে তাই সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়ে সেই মানুষগুলো, যারা আর একবার মায়ের কণ্ঠ শুনতে পারে না। যারা মাঝরাতে কষ্ট পেলে “মা” বলে ডাকলেও কোনো উত্তর পায় না। যাদের জন্য এখন আর কেউ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে না।
অনেকেই আজও মায়ের পুরোনো শাড়ির গন্ধে খুঁজে ফেরেন শৈশব। কেউ মায়ের ব্যবহৃত চশমা, জায়নামাজ কিংবা রান্নাঘরের পুরোনো হাঁড়ি-পাতিল স্পর্শ করে কান্না লুকান। কারণ মানুষ চলে গেলেও মায়ের স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।
মায়ের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি বদলে যায় একটি ঘর। আগে যে ঘরে মায়ের ডাক শোনা যেত, যে রান্নাঘরে মায়ের ব্যস্ততা ছিল, যে উঠোনে সন্ধ্যায় মায়ের অপেক্ষা ছিল– সেই ঘর ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যায়। তখন বুঝতে ইচ্ছে করে, আসলে “বাড়ি” বলতে ইট-পাথরের দেয়ালকে নয়, মায়ের উপস্থিতিকেই বোঝায়।
সমাজের অনেক সফল মানুষও স্বীকার করেন, জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হলো মাকে হারানো। অর্থ, খ্যাতি কিংবা প্রতিষ্ঠা দিয়ে সেই শূন্যতা কখনো পূরণ করা যায় না। পৃথিবীর হাজারো মানুষের ভিড়েও মা হারানো মানুষগুলো ভেতরে ভেতরে এক অদৃশ্য নিঃসঙ্গতা বয়ে বেড়ান।
আজ মা দিবসে তাই শুধু উদযাপন নয়, স্মরণ হোক সেইসব মায়েদেরও, যারা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। যাদের ভালোবাসা আজও সন্তানের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব মা। আর শান্তিতে থাকুন সেইসব মায়েরা, যারা আজ সন্তানের চোখের জলে, স্মৃতির পাতায় আর হৃদয়ের গভীরে বেঁচে আছেন চিরকাল।