তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কিছু সময় পর তার মৃত্যু হয়। আজমল স্বেচ্ছায় ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে, নাকি মেরে উপর থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহত আজমল নগরীর নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সে ওই ভবনের মেসেই ভাড়া থাকতো। তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনায়।
খবর পেয়ে শনিবার ভোরে চুয়াডাঙ্গা থেকে আজমলের বাবা কুতুব উদ্দিন খুলনায় আসেন। তিনি বলেন, ‘রাত ১টার দিকে কয়েকজন ছেলে ফোন করে বলে আপনার ছেলে আমাদের জিনিস চুরি করছে, এখনই এক লাখ টাকা দিতে হবে। আমি বলি, আমি যতো দ্রুত পারি খুলনায় আসছি, এসে তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি। রাতেই বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে ট্রেনে সকাল ৬টায় ওর মেসে পৌঁছায় দেখি কেউ নেই। তখন এলাকার এক মুরুব্বী জানায়, আপনার ছেলেকে ওই রুমের লোকজন পিটিয়ে মেরে ফেলছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের দুটি ছাত্র হলের পাশেই আবাসিক এলাকা। হলে যারা আসন পান না, তাদের বেশিরভাগই ওই এলাকায় ভাড়া থাকেন। খুবির খানজাহান আলী হল গেটের বিপরীতে আকিবের পাঁচতলা ভবন মেস হিসেবে ভাড়া দিয়েছেন। আজমল ওই ভবনের চতুর্থ তলায় খুবির সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে থাকতেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাড়ির মালিক জানান, রাত ১টার দিকে আকিবের ভবন থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে তারা বাইরে আসেন। এ সময় ভবনের চতুর্থ তলায় একজনকে মারধর করতে দেখেন এবং তার চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় নিচে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে জানা গেছে, আজমলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার মাথার চুলও এক পাশ দিয়ে কাটা ছিল এবং পা ভেঙে গিয়েছে। কয়েক জন ছাত্র তাকে হাসপাতালে দিয়ে দ্রুত চলে যান। ভর্তির ১৫/২০ মিনিটের মধ্যেই সে মারা যান।
খবর পেয়ে নগরীর হরিণটানা পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, গত রাতেই আমরা শুনেছি আকিবের পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় চুরির অভিযোগে ঝামেলা হয়েছে। সকালে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, আজমলকে চুরির অভিযোগে ধরে নিয়ে মারপিট করে। পরে সে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে অসুস্থ হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর সে মারা যায়। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি।
নিহত আজমলের বাবা কুতুব উদ্দিন সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, হাসপাতালে গিয়ে আমার ছেলের লাশ দেখেছি। অতিরিক্ত মারধর করেই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি কোর্ট-কাচারি করতে চাই না। কারও প্রতি আমার অভিযোগ নেই। আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। ছেলের লাশটা দিলে আমি বাড়ি চলে যাব।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দিন বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের ঘটনায় আমাদের কিছু করার নেই। তবে আমরা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের সহায়তা করছি।
এদিকে দুপুরের পর ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। এরপর মরদেহ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে তারা।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান, নিহত আজমল হোসেনের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার পা দুটিও ছিল ভাঙ্গা।
শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের বিপরীতে ইসলাম নগর রোডের চারতলা ভবনের ওই মেসে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, ৮টি রুমের ৭টি কক্ষই তালাবদ্ধ। এরমধ্যে ডি-৮ রুমে থাকতেন আজমল হোসেন। তবে ডি-১ কক্ষে নক করতেই বেরিয়ে আসেন খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র লাবিব বিশ্বাস রাসেল।
তিনি জানান, চুরির অভিযোগে মেহেদীসহ কয়েকজন আজমলকে ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মারধর করা হয়। তবে সে কীভাবে মারা যায় তা তিনি পরিস্কার করে বলতে পারেনি। তবে ছাদে গিয়ে দেখা যায়, ছাদের একপাশে অনেক মানুষের পায়ের পাড়ায় ধুলাবালি ও ছ্যাদলা সরে যাওয়ার চিহ্ন রয়েছে।
ওই মেসের পেছনের ভবনের একজন নারী বাসিন্দা বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাত পৌঁনে ১টার দিকে খুব জোরে একটি শব্দ শুনতে পায়। পরে দরজা খুলে বাইরে এসে দেখি বাড়ির সামনে গলির মধ্যে একটি ছেলে পড়ে রয়েছে। পরে ছাত্ররা অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
এর আগে বেলা সাড়ে ১২টায় নগরীর হরিণটানা থানায় গিয়ে দেখা যায়, অফিসার ইনচার্জ এর রুমের সামনে বসে থাকতে দেখা যায় আজমলের পিতা কুতুব উদ্দিনকে আর পেছনের বেঞ্চে নির্বাকভাবে বসে আছেন মা আসমা বেগম।
কুতুব উদ্দিন বলেন, তার দুই ছেলে। বড় ছেলে আজমল। একবছর আগে সে বাড়ি থেকে খুলনায় লেখাপড়ার জন্য আসে। গত বছর সে কোনো বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। মাত্র ১০দিন আগে সে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ^বিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে বাড়ি যায়।
শুক্রবার দুপুরে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনায় আসে। রাত ৯টার দিকে সে ফোন দিয়ে আমাদের সঙ্গে শেষ কথা বলে। তখন সে বলেছিল, আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।
তিনি বলেন, রাত ১২টার পরে আমার ছেলের মোবাইল ফোন দিয়ে অন্য একটি ছেলে বলে, আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত ১ লাখ টাকা নিয়ে আসেন। টাকা না আনলে আপনার ছেলেকে পাবেন না। তখন তিনি বলেন, তাকে আমি বলি আমরা গরীব মানুষ, এক লাখ কোথায় পাবো।
ফোনের বিপরীত দিক থেকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কি করেন, আমি তাকে বলি, আমি কৃষিকাজ করি। তখন সেই ছেলে আবার বলে, আপনি দ্রুত চলে আসেন। সেই সময় আমি বলি আমি ট্রেনে দ্রুত আসছি। তখন সে বলে, আপনি ট্রেনে আসবেন, না বাসে আসবেন, না প্লেনে আসবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। তারপর সকালে এসে দেখি আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।
হরিণটানা থানার ওসি তদন্ত মোঃ মুরাদ হোসেন মিলন বলেন, ঘটনাটির আমরা তদন্ত করছি। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে এক লাখ টাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নিহতের বাবা এরকম কথা আমাদের বলেছেন। সত্যতা যাচাই-বাছাই করছি।