শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

আন্তর্জাতিক

কাশ্মির, বেলুচিস্তান ও পাকিস্তানের গণতন্ত্রের সংকট

কাশ্মির, বেলুচিস্তান ও পাকিস্তানের গণতন্ত্রের সংকট

প্রতি বছর ৫ আগস্ট পাকিস্তান ‘ইউম-ই-ইস্তাহসাল’ বা ‘শোষণ দিবস’ পালন করে। ২০১৯ সালের এই দিনে ভারত সরকার জম্মু-কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং কাশ্মিরের জনগণের প্রতি সংহতি জানাতে পাকিস্তান দিনটি পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পাকিস্তানের বক্তব্য—কাশ্মিরের মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার জন্যই তাদের এই অবস্থান।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানবাধিকারের এই দাবি কতটা সার্বজনীন? নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের একটি কৌশল? কারণ, যে রাষ্ট্র অন্য দেশের নাগরিকদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়, সেই রাষ্ট্রের নিজের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে যখন জনগণের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার অবস্থান নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।

পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মিরের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই সংশয়কে আরও গভীর করেছে। সেখানে রাজনৈতিক অধিকার, প্রতিনিধিত্ব এবং ইসলামাবাদের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, তা নিছক একটি স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ নয়; বরং এটি পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও মানবাধিকারের প্রতি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের বড় পরীক্ষা।

বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মিরের আইনসভায় কাশ্মিরের বাইরের শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করা। তাদের অভিযোগ, এই আসন ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামাবাদ কাশ্মিরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বজায় রাখে। দীর্ঘদিনের এই অসন্তোষ যখন রাস্তায় নেমে আসে, তখন সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল সংলাপের পথ খোলা রাখা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন এবং শত শত আহত হয়েছেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের এমন ব্যাখ্যা তখনই গ্রহণযোগ্যতা পায়, যখন সেখানে স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কি নাগরিকদের দাবি মোকাবিলায় প্রথমে অস্ত্র ব্যবহার করবে, নাকি সংলাপ ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নেবে?

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংকট মোকাবিলায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষা। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ যখন পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মিরের বিক্ষোভকারীদের ‘শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, তখন তা শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য থাকে না; বরং এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের গভীর সংকটকে প্রকাশ করে। গণতন্ত্রে ভিন্নমত কখনো শত্রুতা নয়। প্রতিবাদী কণ্ঠকে দেশবিরোধী বা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করে।

মানবাধিকারের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দ্বৈত মানদণ্ড। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাশ্মিরের মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় ইসলামাবাদ মানবিক মূল্যবোধের কথা তুলে ধরে। কিন্তু নিজ দেশের ভেতরে বেলুচিস্তান, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখোয়া কিংবা পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মিরে একই নীতির প্রতিফলন কতটা ঘটছে—সেই প্রশ্নের উত্তর তারা এড়িয়ে যেতে পারে না।

বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বছরের পর বছর ধরে সেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের সন্ধান এবং জবাবদিহির দাবি জানিয়ে আসছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জোরপূর্বক গুম, নির্বিচার আটক এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ তুলে আসছে। পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগের জবাবে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। কিন্তু নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিক অধিকার উপেক্ষিত হলে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে না।

ইতিহাসও পাকিস্তানের সামনে বড় শিক্ষা রেখে গেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে ছিল রাজনৈতিক অধিকার অস্বীকার, নির্বাচনী রায়কে উপেক্ষা করা এবং জনগণের ন্যায্য দাবির জবাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগের দীর্ঘ ইতিহাস। জনগণের কণ্ঠকে দমন করে কোনো রাষ্ট্র স্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। শক্তি দিয়ে সাময়িক নীরবতা তৈরি করা যায়, কিন্তু মানুষের অধিকার ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাকে কখনো নিশ্চিহ্ন করা যায় না।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পাকিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা শুধু বাইরের বিশ্ব থেকে আসছে না। দেশটির ভেতর থেকেও প্রশ্ন উঠছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোদি এবং বিভিন্ন বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের নীতি ও আচরণের মধ্যে অসঙ্গতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এসব সমালোচনাকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দেওয়া বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।

অবশ্যই পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ ও নিরাপত্তা সংকটের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ তাকে নাগরিক অধিকারের প্রতি উদাসীন হওয়ার লাইসেন্স দিতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার সামরিক সক্ষমতায় নয়; বরং সংকটের সময় নাগরিকদের অধিকার কতটা রক্ষা করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা স্পষ্টভাবে বলে—রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয়, সীমিত এবং জবাবদিহিমূলক। রাজনৈতিক দাবি ও নাগরিক অসন্তোষ মোকাবিলার প্রধান মাধ্যম হওয়া উচিত আলোচনা, সমঝোতা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।

পাকিস্তান যদি সত্যিই মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে চায়, তবে সেই অবস্থানের শুরু হতে হবে নিজের ভূখণ্ড থেকেই। পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মির, বেলুচিস্তান, সিন্ধু কিংবা খাইবার পাখতুনখোয়ায় নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে না পারলে আন্তর্জাতিক ফোরামে মানবাধিকারের পক্ষে তাদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।

মানবাধিকারের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘোষণা কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মঞ্চে নয়; বরং একটি রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের সঙ্গে কী আচরণ করে, তার মধ্যেই প্রকাশ পায়। পাকিস্তানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—মানবাধিকারের ভাষণ দেওয়া নয়, বরং সেই মূল্যবোধ বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা।

আরও

ইসরায়েলি উড়োজাহাজের অবতরণে অনুমতি বাতিল, দুবাইয়ের বিশেষ ফ্লাইট স্থগিত

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলি উড়োজাহাজের অবতরণে অনুমতি বাতিল, দুবাইয়ের বিশেষ ফ্লাইট স্থগিত

সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর দুবাইয়ে অবতরণের অনুমতি বাতিল করায় দুবাইয়ে আটকে থাকা ইসরায়েলিদের দেশে ফে...

২০২৬-১০-০২ ১৮:৫৩

চীনের চাপের মধ্যে তাইওয়ানে পৌঁছাল প্রথম দুই এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান

আন্তর্জাতিক

চীনের চাপের মধ্যে তাইওয়ানে পৌঁছাল প্রথম দুই এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান

চীনের সামরিক চাপের মধ্যে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা ৬৬টি এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ যুদ্ধবিমানের প্রথম...

২০২৬-১০-০২ ১৪:৫৭

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নয় সম্পদ নিয়ন্ত্রণই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য : আইআরজিসি

আন্তর্জাতিক

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নয় সম্পদ নিয়ন্ত্রণই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য : আইআরজিসি

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক অভিযানের মূল কারণ দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নয় বলে দাবি করেছে ইসলামিক রেভল্য...

২০২৬-০৯-২৯ ১৪:৫৮

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, শেষ হচ্ছে দুই দশকের উপস্থিতি

আন্তর্জাতিক

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, শেষ হচ্ছে দুই দশকের উপস্থিতি

দুই দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক সম্পৃক্ততার অবসান ঘটিয়ে বুধবারের মধ্যে ইরাক থেকে শেষ ঘাঁটিগুলোও গুটিয়ে নিতে যাচ্ছে মার্কিন...

২০২৬-০৯-২৯ ১৪:৪৯