এই আয়োজনের মধ্য দিয়েই ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর যাত্রা শুরু হয়। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে আম্বানির জিও প্ল্যাটফর্মস সংগ্রহ করেছে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
টেলিযোগাযোগ থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতে বিস্তৃত এই কোম্পানির শেয়ারের দাম বুধবার এক লাফে ২১ শতাংশ বেড়েছে। এতে জিওর বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্য দিয়ে নিজেদের মূল প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের পর ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজারমূল্যের কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে জিও।
২০২০ সালে বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা ও গুগলের কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পায় জিও প্ল্যাটফর্মস। এরপর আম্বানি পরিবারের এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অন্যতম বিনিয়োগের গন্তব্য হয়ে ওঠে। বর্তমানে জিওর গ্রাহকসংখ্যা ৫৩ কোটির বেশি।
উদ্যাপন অনুষ্ঠানে মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে এবং কোম্পানিটির বোর্ডের অতিরিক্ত পরিচালক অনন্ত আম্বানি বলেন, ‘জিও হয়তো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু এটি ভারতের প্রতিটি ডিজিটাল স্বপ্নের মধ্যে স্পন্দিত হয়। আজ জিও ভারতের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।’
কিন্তু কীভাবে ভারতের অন্যতম প্রতিযোগিতাপূর্ণ টেলিযোগাযোগ বাজারে এত বড় পরিবর্তন আনল জিও? কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছাল প্রতিষ্ঠানটি? আর এই উত্থানের মধ্য দিয়ে কীভাবে ভারতের টেলিকম বাজার এমন একটি কাঠামোয় পৌঁছাল, যাকে অনেক বিশ্লেষক অলিগোপলি বা স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন বাজার বলে বর্ণনা করছেন?
জিও কী, আম্বানিই বা কে?
ফোর্বস সাময়িকীর হিসাব অনুযায়ী, মুকেশ আম্বানির মোট সম্পদের পরিমাণ ৮০ বিলিয়ন ডলার। তিনি এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতের জনসংখ্যা ১০০ কোটির বেশি। দেশটির অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে আম্বানি পরিবারের ব্যবসায়িক প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে অনেকেই ভারতকে ‘আম্বানির জগৎ’ বলে বর্ণনা করেন।
বাবার কাছ থেকে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের উত্তরাধিকার পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বহুমুখী করেছেন ৬৯ বছর বয়সী মুকেশ আম্বানি। বস্ত্র ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ব্যবসা থেকে বেরিয়ে তিনি শিল্পগোষ্ঠীটিকে আরও অনেক খাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
খাদ্য ও বস্ত্র থেকে জ্বালানি, ইন্টারনেট ও স্ট্রিমিং—ভারতের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন আম্বানি পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের প্রভাব রয়েছে।
গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দুই দিনের সফরে ভারতে এসেছিলেন। এ সময় তিনি গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকানাধীন তেল শোধনাগার কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন।
রুবিও ওই সফরে নয়াদিল্লি যাননি। বরং ভারতের মন্ত্রীদের তাঁর সঙ্গে দেখা করতে জামনগরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
যেভাবে ভারতের বৃহত্তম টেলিকম অপারেটর হলো জিও
২০১৬ সালে ভারতীয় টেলিযোগাযোগ বাজারে প্রবেশ করে রিলায়েন্স জিও। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের প্রতি গিগাবাইট মোবাইল ডেটার জন্য গড়ে প্রায় ৭ ডলার খরচ করতে হতো। বিপরীতে, ভারতে জিও প্রথম কয়েক মাস গ্রাহকদের বিনা মূল্যে ডেটা ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টেলিযোগাযোগ বাজার ভারতে আমূল পরিবর্তন আসে।
ব্যবসা শুরুর মাত্র ১৭০ দিনের মধ্যে ১০ কোটি গ্রাহকের মাইলফলক অতিক্রম করে জিও। সে সময় এটিকে বিশ্বে কোনো মোবাইল অপারেটরের দ্রুততম গ্রাহক অর্জনের সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
জিওর শুরুর দিনগুলোতে ভারতের শহরগুলোতে সিম কার্ড সংগ্রহের জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যেত। বিভিন্ন স্থানে সিম বিতরণের জন্য অস্থায়ী তাঁবুও স্থাপন করা হয়েছিল।
তবে ভারতের তৎকালীন বৈচিত্র্যময় টেলিকম বাজারে প্রবেশ করা সহজ ছিল না। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাজারে প্রবেশের জন্য জিও প্রায় ২২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। এই অর্থ ব্যয় করা হয় স্পেকট্রাম অধিগ্রহণ, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো এবং ফাইবার ব্যাকহল তৈরিতে।
রিলায়েন্সের বিপুল আর্থিক সহায়তা নিয়ে বাজারে প্রবেশ করে জিও। শুরুতে পরিচালনগত লোকসান মেনেও বিপুলসংখ্যক গ্রাহক অর্জনের কৌশল নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
এর ফলে প্রতিযোগী টেলিকম কোম্পানিগুলোও তাদের সেবার দাম ব্যাপকভাবে কমাতে বাধ্য হয়। মোবাইল ডেটার ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। লাখ লাখ ভারতীয় প্রথমবারের মতো স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পান।
মাত্র তিন বছরের মধ্যে গ্রাহকসংখ্যার দিক থেকে ভারতের বৃহত্তম টেলিকম অপারেটরে পরিণত হয় জিও।
পরবর্তী সময়ে জিওকে একটি বিস্তৃত ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে রূপ দেন আম্বানি। এতে যুক্ত হয় বিনোদন ও স্ট্রিমিং সেবা জিওসিনেমা। এই প্ল্যাটফর্মে চলচ্চিত্র, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার সম্প্রচার করা হয়। পাশাপাশি ক্লাউড স্টোরেজ ও অন্যান্য ডিজিটাল সেবা দিতে চালু করা হয় জিওক্লাউড।
জিওর উত্থানের মূল্য কত?
২০১৬ সালে জিওর যাত্রা শুরুর পর থেকে মুকেশ আম্বানির সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮ গুণ। অর্থের হিসাবে এই বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার।
সায়েন্সডাইরেক্টে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, জিওর বাজারে প্রবেশের ফলে ভারতে গ্রাহকপ্রতি টেলিকম কোম্পানিগুলোর গড় আয় ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। ২০১৬ সালে যেখানে এই আয় ছিল প্রায় ১ দশমিক ৩২ ডলার, ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৫ সেন্টে।
গবেষকদের মতে, টেলিযোগাযোগ খাতে এ ধরনের মূল্যহ্রাস ছিল নজিরবিহীন। এর ফলে ভারতের টেলিকম বাজার ধীরে ধীরে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
একসময় ভারতের বাজারে ১০টি টেলিকম অপারেটর সক্রিয় ছিল। কিন্তু এর মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে অথবা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে বাজার থেকে বিদায় নেয়। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এয়ারসেল, ভিডিওকন, টেলিনর ইন্ডিয়া, টাটা টেলিসার্ভিসেস ও রিলায়েন্স কমিউনিকেশনস।
মুকেশ আম্বানির ছোট ভাই অনিল আম্বানির প্রতিষ্ঠিত রিলায়েন্স কমিউনিকেশনসও বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হওয়ার আবেদন করে।
একসময় বাবার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের যৌথ উত্তরাধিকারী ছিলেন মুকেশ ও অনিল আম্বানি। ২০০২ সালে তাঁদের বাবার মৃত্যুর পর রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ ভাগাভাগি নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘ ও তিক্ত বিরোধ শুরু হয়। বছরের পর বছর ধরে তাঁদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছে।
বর্তমানে ভারতের টেলিকম বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে জিও ও এয়ারটেল। অন্যদিকে আর্থিক সংকটে রয়েছে ভোডাফোন আইডিয়া। এই তিন অপারেটরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ভারতের টেলিকম বাজারের ৯২ শতাংশের বেশি।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, জিওর প্রবেশের পর শুরু হওয়া মূল্যযুদ্ধে গ্রাহকেরা সস্তায় টেলিকম সেবা পেয়েছিলেন। কিন্তু বাজার পুনর্গঠিত হওয়ার পর সেই সুবিধা অনেকটাই কমে গেছে।
এর একটি উদাহরণ দেখা যায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। ওই মাসে জিও তাদের সব ধরনের প্যাকেজের দাম প্রায় ১২ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়ায়। অন্য টেলিকম অপারেটররাও একই পথে হেঁটে সেবার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায়।
আইপিও-সংক্রান্ত ঘোষণায় জিও জানিয়েছে, টেলিকম সেবার দাম বাড়ালেই যে আয় বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, দাম বাড়লে গ্রাহকেরা কম দামের প্যাকেজ বেছে নিতে পারেন। এমনকি অন্য অপারেটরের কাছেও চলে যেতে পারেন।
এরপর জিও ও আম্বানির পরিকল্পনা কী?
এবার মহাকাশভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার বাজারেও প্রবেশের পরিকল্পনা করছে জিও। এ জন্য পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইলন মাস্কের স্টারলিংকের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে পারে জিও। স্টারলিংকও কয়েক বছর ধরে ভারতে সেবা চালুর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে রিলায়েন্স গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রেও বিনিয়োগ করেছে। গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জামনগরের বিশাল তেল শোধনাগার ঘুরিয়ে দেখান মুকেশ আম্বানি। সেখানে তাঁরা ভেনেজুয়েলা থেকে আরও বেশি তেল এনে প্রক্রিয়াজাত করার বিষয়েও আলোচনা করেন।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইলন মাস্ক সম্প্রতি আম্বানির কঠোর সমালোচনা করেছেন।
মাস্কের মহাকাশভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক ভারতে কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স পেতে কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।
বিভিন্ন পোস্টে মাস্ক অভিযোগ করেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বাজারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান আম্বানির জিওকে সুবিধা দিতে স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
এমনকি সরাসরি আম্বানিকে বিদ্রূপ করে তাঁকে ‘প্রধানমন্ত্রী আম্বানি’ বলে সম্বোধন করেছেন মাস্ক। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আম্বানি স্টারলিংককে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করবেন কি না।
মাস্কের অভিযোগ, ভারতীয়দের ওপর নিজেদের ‘একচেটিয়া আধিপত্য’ বজায় রাখতে ‘অলিগার্করা’ স্টারলিংকের প্রবেশ আটকে রেখেছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে রিলায়েন্স। অমুক তারিখে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তারা ‘কখনোই প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়নি’। বরং ‘এমন এক ভারতে বেড়ে উঠেছে, যেখানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—সব ধরনের বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনকে স্বাগত জানানো হয়’।
সূত্র: আল-জাজিরা